No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ডুয়ার্সের ফুলের বাগানে যুদ্ধবিরোধী পাঠশালা

    ডুয়ার্সের ফুলের বাগানে যুদ্ধবিরোধী পাঠশালা

    Story image

    যুদ্ধবিরোধী পাঠশালা বসেছে ফুলের বাগানে। উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স এলাকার বানারহাট নিবাসী এক চিকিৎসক ডাঃ পার্থপ্রতিম ফুলের জলসায় খুলেছেন সেই পাঠশালা। তাঁর অভিনব পাঠশালা সবুজ চা বাগানময় ডুয়ার্সে অনেকের মুখে মুখে ফিরছে। অসুস্থ মানুষকে বাঁচিয়ে তোলা বা সুস্থ রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেন ডাঃ পার্থপ্রতিম। কিন্তু রোগী দেখার ফাঁকে তিনি এখন জীবনের পাঠ শেখাচ্ছেন পাড়াপড়শি ও কচিকাঁচাদের। তাঁর বাড়ির মধ্যেই সে বাগান। আর সে বাড়ির নাম মধুবন। মধুবনে পড়াশোনা করছে একদল ছেলেমেয়ে। ক্লাস নিচ্ছেন ডাক্তারবাবু নিজেই।

    বানারহাট আদর্শপল্লিতে সবুজ গাছগাছালি ঘেরা ছোট্ট বসতবাড়ি ডাক্তারবাবুর। ফুলের বাগান করা তাঁর বহুকালের শখ। ফি বছর নানারঙের পেনজি, চন্দ্রমল্লিকা, পিটুনিয়া, স্যালভিয়া, সুইটিলিয়াম আরও কত কত ফুল মাথা নাড়ে তাঁর উঠোন জুড়ে। পুষ্পচর্চা হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনচর্চারই অঙ্গ। ডাঃ পার্থপ্রতিম বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “ছোট্ট চারাগাছ একদিন ফুলে ভরা গুল্ম হয়ে ওঠে। তারপর একদিন ফুলহীন, বিবর্ণ হয়ে মারা যায়। আমাদের মানবজীবনটাও তাই। মায়ের কোল আলো করা ছোট্ট শিশুটি একদিন শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পৌঁছে যায়। তার উদ্যাম, কর্মশক্তি, সৃজনশীল প্রয়াস অভিনন্দিত হয় সমাজের বিভিন্ন স্তরে। তারপর একসময় বার্ধক্যের পথ পেরিয়ে বিদায় নেয় এই পৃথিবী থেকে।”

    ডাক্তার পার্থপ্রতিম বলেন, জীবনের এই রৈখিক গতি পুষ্পচর্চার মধ্যে দিয়ে ভালোভাবে উপলদ্ধি করা যায়। সত্তর-আশি বছরের মানবজীবনের কথকথা; তিন-চার মাসেই পুষ্পচর্চার মধ্যেই মূর্ত হয়ে ওঠে। বোঝা যায় জীবনের নশ্বরতা। আমাদের এই মানব জীবন যে চিরস্থায়ী নয়, এই বোধ আমাদের মনোজগতে থাকলে রাগ, অভিমান, হিংসা, বিদ্বেষ এগুলি জয় করা সম্ভব। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, এই রিপুগুলি মানবদেহের অঙ্গ, তন্ত্র, হৃদয়ের ওপর নিঃশব্দে আঘাত হানে। তারই সঙ্গে সমাজ ও সভ্যতার পরিপন্থী ঘটনাগুলি ঘটে। 

    রোগী দেখার ফাঁকে তিনি এখন জীবনের পাঠ শেখাচ্ছেন পাড়াপড়শি ও কচিকাঁচাদের। তাঁর বাড়ির মধ্যেই সে বাগান। আর সে বাড়ির নাম মধুবন। মধুবনে পড়াশোনা করছে একদল ছেলেমেয়ে। ক্লাস নিচ্ছেন ডাক্তারবাবু নিজেই।

    মধুবন বিতানে মাঝে মধ্যে আসর বসে। পাড়াপড়শি, কচি-ধেড়ে সবাই আসে এই জীবনের পাঠশালায়। স্থানীয় পড়শি গৃহবধু বাসন্তী ঘোষ বললেন, “সাংসারিক কাজে কখনও মনখারাপ হলে চলে আসি মধুবনের ফুল বাগানে। মুহূর্তে মন ভালো হয়ে যায়। আর ডাক্তারবাবু যে সুন্দরভাবে বিষয়গুলি বোঝান তাতে মন ভরে যায়।”

    একই বক্তব্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিশ্বনাথ ভট্টাচার্যের। তিনি বলেন, “ডাক্তারবাবু মনের আবেগে বহু কিছু করেন; যা সমাজ ও সভ্যতা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনুকূল ভূমিকা পালন করে।”

    পার্থবাবু দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক কাজে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। নামের সঙ্গে সংস্কারমূলক পদবি ব্যবহার করেন না। জাতি-ধর্ম-বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এটাই তার জেহাদ। চিকিৎসক জীবনের ব্যস্ততার ফাঁকে ল্যাপটপ-প্রোজেকটর কাঁধে পৌঁছে যান স্কুল-ক্লাবে; জনমানসকে বোঝান স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের নাড়ি-নক্ষত্র। বহু প্রবন্ধ লিখেছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর সৃজিত ই-বুক প্রশংসিত হয়েছে গুণিজন মহলে। প্রাদেশিক ও জাতীয় স্তরে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।

    গত বছর ২৪ ফেব্রুয়ারি (২০২২) থেকে যুদ্ধ চলেছে ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার। রঙীন বসন্তের দিনে যুদ্ধের দামামা বেজেছিল আমাদের এই পৃথিবীতে। এই যুদ্ধে ইতিমধ্যেই ভেঙে পড়েছে বহু সেতু, ইমারত, বসতবাড়ি, মানুষের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন। বিপন্ন হয়েছে বহু শিশু-কিশোর, বোমা-মিসাইলের আঘাতে মারা গিয়েছে নিরাপরাধ প্রাণ, পরিযায়ী পাখি ও বন্যপ্রাণী। এই প্রেক্ষাপটে ডুয়ার্সের ফুলের বাগানে যুদ্ধবিরোধী পাঠশালা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। রক্তিম ডালিয়ার দিতে অপলক চেয়ে চিকিৎসক বলেন, “যদি আগামীকালও পৃথিবীর শেষ দিন হয়, তবুও আজ আমরা সবাই সৃজনশীল প্রয়াস চালিয়ে যাবো।”

    ____

    ছবি: প্রতিবেদক

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @