No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    আখড়াবাড়ির লেখা

    আখড়াবাড়ির লেখা

    Story image

    এক
    আখড়াবাড়িতে আমাদের দরমা ঘেরা দুটো মাত্র ঘর। যখন ফকির - বাউল - সাধুগুরুরা আসেন স্থান সংকুলান হয় না । একতারা, দোতারা, খমক, ডুবকির মাঝে চুপটি করে বসতে হয়। বেশি নড়াচড়া করা যায় না। গুরুজি গান ধরেন। সন্ধ্যার পর মাধুকরী করে ফিরে চালপানি নিতে হয় আমাদের। সে সময় যে গান গাওয়া হয় তাকে বলা হয় দৈন্য গান। গুরুর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে এই গানগুলো রচিত। সেই গান পর্ব চলতে থাকে একদিকে আর দাওয়ায় গুরুমা মাধুকরী করে আনা নানা সাইজের চাল বেছেটেছে কাঠের উনুনে ভাত চাপান। আখড়াবাড়িতে একটুকরো জমি। সেখানে এই শীতে পালং, মূলো, ফুলকপি, ধনেপাতা করেছি আমরা। আর আছে গাছের পেঁপে। চালে মেটেআলুর গাছ। আমাদের ছোট পুকুরে এখন নধর কইমাছ। গুরুমা নিজের হাতে ডালের বড়ি দেন। বড়ি - মেটেআলু দিয়ে কইমাছের ঝোল, ফুলকপির ঝোলে ধনেপাতা দেওয়া আর পালং শাক ভাজি। এই দিয়ে আমাদের রাতের সেবা। আসলে যা যেদিন জোটে আর কি। গুরুমা নিজের হাতে সব রান্না করেন। আমরা শিষ্যছেলেরা মাকে একটু সাহায্য করি। এই সময় গান ওঠে। মহাজনী পদ। ফকির লালন সাঁই, কুবির গোঁসাই, শাহ আবদুল করিম, রাধারমণ। গান আর গাঁজার গন্ধে ম ম আমাদের আখড়াবাড়ি। সঙ্গে গুরুমা -র রান্নার গন্ধ। মাকে একটু সাহায্য করি আমিও। ফকির - বাউলদের জন্য গাঁজা সাজি। আমরা চন্দন বেটে গাঁজার সঙ্গে ডলে সেবা নিই। গাঁজার সঙ্গে সাধনার কোনও সম্পর্ক নেই। আসলে দেহসাধনা স্থূলতা থেকে সূক্ষ্ণে চলার সাধনা। নেশা এখানে সেই অর্থে ব্যবহৃত। গানের পর আমরা কলাপাতায় করে সেবা নিই। গরম ভাত আর ভাজি - তরকারি - মাছের ঝোলের গন্ধে আখড়াবাড়ি আবার ম ম করে। সবার সেবা হলে গুরুজি আর গুরুমা সেবা নেন। এই হল আখড়াবাড়ির জীবন। আমি এখানকার রোজকার নয়, মাঝে মাঝের অংশীদার মাত্র।

    দুই
    গুরু মুর্শিদের পদ কত যত্ন নিয়ে গাইতেন তিনি। তাঁর গায়কিতে ছিল ভক্তি ও দরদ। রাধারমণের গান ছিল প্রিয়। প্রিয় ছিল সিলেট তথা গোটা হাওর। হাসন রাজা, ফকির লালন শাহ, শাহ আবদুল করিম, দুর্বিন শাহ। তাঁর কথায় হাওরের গানের ঢেউ খেলত। বিচ্ছেদী, মনসার গান, মুসলিম বিয়ের গান, গুরুতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, নবীতত্ত্ব, রাসুলতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, ভাটিয়ালি সব তাঁর দরদে প্রাণ পেত। হাওর ও অসম ---- লোকায়ত গানের এই দুই অঞ্চল তাঁর সুরে বয়ে যেত। কালিকাপ্রসাদ, দোহার --- একই সত্তার ঘরবাড়ি। আজ চলে গেলেন। কুষ্টিয়া, রাজশাহী, যশোর, সিলেট, ময়মনসিংহ, নদিয়া, বীরভূম, বর্ধমান , মুর্শিদাবাদের বাউল ফকিরি গান তাঁর মতো বিশুদ্ধতা নিয়ে গাইতে পারত কজন। আমাদের আখড়াবাড়িতে এলে পায়ে হাত দিয়ে গুরুজিকে প্রণাম করত। গুরুমার কাছ থেকে কুবির গোঁসাইয়ের গান তুলত পরম নিষ্ঠায়। খবরটা শোনার পর গুরুমা নিস্তব্ধ হয়ে বসে। আখড়ায় বড় শোকের দিন আমাদের।সন্ধ্যায় চালপানি নেওয়ার পর ফকির বাউলেরা আজ দৈন্য গান গাওয়ার পর কালিকাপ্রসাদের জন্য প্রার্থনা রাখবেন। মনের মানুষ চলে গেলেন। সাঁইজির দেশে যাক কালিকা। এই প্রার্থনা করি এস বন্ধু।সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা কে জানে।

    তিন
    রংদোল মারফতি পন্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই যে ফকির বাউলরা রংদোলে আখড়ায় সাধুসঙ্গের সমাবেশ ঘটান, বাউল ফকির ভৈরবী সাধু তান্ত্রিকগুরু ভৈরব বৈষ্ণব বৈষ্ণবী সহজিয়া মানুষদের আগমন ঘটে আখড়ায় --- এর সূত্রপাত বোধহয় ফকির লালন শাহের হাত ধরে ছেঁউরিয়াতে। সারা বছর ধরে ফকির বাউলরা কী চিন্তা করলেন কী ভাবলেন কী অনুভূত সত্য সামনে এল মুর্শেদের হাত ধরে সেই উপলব্ধ সংগীত ও কথা প্রকাশ্যে নানা মুর্শেদ - গুরু, বায়েত - বয়াতিদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার জন্যই আদতে রংদোলের আখড়ায় সাধু সমাগমের আয়োজন। তাছাড়া পূর্ণিমা পূর্ণচন্দ্র চন্দ্রসিদ্ধি মারফতি সাধনার প্রধান পথ। অমাবস্যার ভেতরে চাঁদের উদয় শরীরের রসের খেলায় রসনিবৃত্তি দমশ্বাসে হাওয়ার খেলায় যুগল ভজনায়। সেই ভজনায় পূর্ণাবয়ব সত্যকে উপলব্ধির আধারকে সাধুসঙ্গে ভাগ করে নেওয়াটাই রংদোলের আখড়াগানের আসল উদ্দেশ্য। ঠিক যেমন শঙ্করাচার্য করেছিলেন একই উদ্দেশ্য নিয়ে কুম্ভ সমাগম। এর পেছনের পৌরাণিক কাহিনিটি তো নিমিত্ত মাত্র। আসল উদ্দেশ্য সাধনার অনুভূত সত্যকে সাধু সমাগমে ছড়িয়ে দেওয়া। নানা আধারে নিজেকে মিশিয়ে নিজের আধার ঘরানা গুরু পরম্পরাকে সকলের সামনে তুলে ধরা। কুষ্টিয়ার লালন সাঁই এই উদ্দেশ্যটি নিয়েই রংদোলের আখড়া করেছিলেন। ফকির বাউলের রংদোলে উৎসব অনুষ্ঠান ও জমায়েতের পেছনে এই পটভূমিকাটিই বাস্তবিক প্রেক্ষাপট। মিথ কিংবদন্তি অলৌকিকতা বিশ্বাসের দরজার সতী মায়ের দোলও আসলে এভাবে দাঁড়িয়ে। দাঁড়িয়ে লোকধর্মের সমস্ত আখড়াবাড়ি আর বাউল ফকিরি গানের জমায়েতের আসর।

    চার
    প্রথম যখন জয়দেবে যাই, কেঁদুলির মেলায়, বাউল ফকিরদের আখড়ায়, তমালতলায় সুধীর খ্যাপার আখড়া ঘুরে বেশ রাতে যখন মেলা ভাঙার পর্ব উঠছে,মনোহর খ্যাপার বেদনাশা বটমূলের আখড়ায়, তখন কালাচাঁদ দরবেশ অঝরে কাঁদছেন আর গুরুর বটমূলের সেই সমাধি মাটি মাথায় গায়ে মাখছেন, সে সময় প্রভাতী গাওয়ার উদ্যোগ করছেন বিশ্বনাথ দাস বাউল। প্রভাতী হল আখড়া ভাঙার গান। এর পর শত অনুরোধেও গান গাবেন না ফকির বাউল। প্রভাতী শুনে আখড়ার খড় বিছানো তাবুর ঘরে এসে দেখি আমার ব্যাগ ক্যামেরা ঘড়ি চশমা টাকাপয়সা - যাবতীয় জিনিসপত্র হাওয়া। শুনলাম মেলা ভাঙার আগ মুহূর্তে এই চুরিও জয়দেবের বৈশিষ্ট্য। আমি সেবার প্রথম বলে জিনিস সামলে না রেখেই প্রভাতীর আসরে। পরদিন ফেরা। আমার টাকাপয়সা কিছু নেই। বিখ্যাত বাউল পূর্ণদাসের দিদি রাধারানি দাসী তাঁর আঁচলের খুঁট খুলে পাওয়া প্রণামী আমায় দিলেন বাড়ি ফেরার জন্য। বিশ্বনাথ দাস বাউল বললেন, ওরে খ্যাপা, জয়দেব কারওকেই নিঃস্ব করে না। এই জয়দেব, বাউল ফকির তোমাকে এত দেবে শেষমেশ যে নিয়ে কুল করতে পারবে না। কাল আখড়াবাড়িতে এসেছেন বিশ্বনাথ দাস বাউল। ওঁর হাতে তখন বাউল বাউলনির দেহসাধনা বইখানা। বাংলাদেশ থেকে বেরোনো পশ্চিমবঙ্গের বাউল ওঁর চাই এককপি। আমাকে বললেন বিশ্বনাথ,দেখলে তো খ্যাপা জয়দেবে হারানো পার্থিব বস্তু কীভাবে আজ অপার্থিব আনন্দে ফিরে আসছে তোমার জীবনে। আমি নিরুত্তর হয়ে কেবল বিশ্বনাথ দাস বাউলকে বুকে টেনে নিলাম। গুরুজি তখন একতারাতে বোল তুলছেন। সান্ধ্যকালীন দৈন্য গানের আসর শুরু হবে আখড়াবাড়িতে।অনেক দিন পর গুরুমা গাইবেন সাঁইজির দৈন্য গান।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @