আদিল হুসেনের ‘মাটি’তে পা

দাদাকে না জানিয়ে একদিন বিকেলের পর আমার এক বন্ধুর সঙ্গে রাত্রি পর্যন্ত কলকাতা আবিষ্কার করতে বেরিয়েছিলাম। তখন সবকিছুকেই জীবনের থেকে বড় মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল কলকাতা আমায় গিলে ফেলেছে। কলকাতা নিয়ে নিজের স্মৃতির ভাঁড়ার খুললেন আদিল হুসেন। মুখোমুখি ‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রতিনিধি জয়িতা গাঙ্গুলি।
সিনে-প্রেমীদের কাছে আদিল হুসেনকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। বলিউড থেকে হলিউড, আঞ্চলিক ছবি থেকে ইন্দো-ইউরোপীয় প্রযোজনা, সেরা সেরা ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শক এবং সমালোচকদের মুগ্ধ করেছে। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে অ্যাং লি’র ‘লাইফ অফ পাই’, শুভাশিস ভুতিয়ানি’র ‘মুক্তিভবন/হোটেল সালভেশন’, ইরম হকের ‘হোয়াট উইল পিপল সে’, মীরা নায়ারের ‘দ্য রিলাক্ট্যান্ট ফান্ডামেন্টালিস্ট’, ইটালো স্পিনেলি’র ‘গাঙ্গোর’, ‘দ্য ভায়োলিন প্লেয়ার’, ‘বায়োস্কোপওয়ালা’র মতো ছবি। তবে, শুধু অন্যধারার ছবি নয়, আদিল স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেন তথাকথিত মূলস্রোতের সিনেমাতেও। ‘ইংলিশ ভিংলিশ’, ‘লুটেরা’, ‘ম্যায়ঁ অউর চার্লস’, ‘ইশকিয়া’, ‘এজেন্ট বিনোদ’, দোবারা’, ‘আইয়ারি’ তারই দৃষ্টান্ত। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বহু পুরস্কারে ভূষিত আদিলের হাতে এখন প্রচুর বাংলা ছবি। আমাদের প্রতিনিধি জয়িতা গাঙ্গুলি’র সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে বেরিয়ে এল অভিনেতার জীবনের নানা গল্প। হয়ত এক অন্য সত্তাও।
• ২০১৮ সাল তো আপনার কাছে বাংলা ছবিরই বছর...
(হেসে) এর আগেও আমি বাংলা ছবি করেছি। যেমন ধরুন ‘ইতি শ্রীকান্ত’, ‘কাচের দেওয়াল’, অথবা ‘হর হর ব্যোমকেশ’। তবে ২০১৮ সালটা অবশ্যই স্পেশাল। লীনা গঙ্গোপাধ্যায় আর শৈবাল ব্যানার্জির পরিচালনায় ‘মাটি’ আর প্রীতম ডি. গুপ্তের পরিচালনায় ‘আহারে মন’ খুব শীঘ্রই মুক্তি পেতে চলেছে। এছাড়া সবেমাত্র অর্জুন দত্তের ‘অব্যক্ত’ আর অভিরূপ বসুর স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি ‘মিল’-এর শুটিং শেষ করলাম। এই যে আমি একের পর এক ‘নেমন্তন্ন’ পাচ্ছি, তাতে আমি বেশ খুশি।
• ‘মাটি’ করতে আপনি কীসের জন্য রাজি হলেন?
এই ছবিটায় আমার চরিত্রের নাম ছিল জামিল। আমি স্ক্রিপ্ট থেকে চরিত্রটার গতিপ্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করছিলাম। স্ক্রিপ্ট পড়ে আমার মনে হল যে লীনাজি’র সাথে ‘মাটি’-র গল্পটার গভীর সংযোগ আছে। লীনাজি’কে জিজ্ঞেস করাতে তিনি ইতিবাচক উত্তর দিলেন। এই ছবির স্বাদ এবং স্বর দুটোই তাই খাঁটি। তার ওপর দেশভাগ একটা আন্তর্জাতিক বিষয়। এবং সবচাইতে বড় কথা কী জানেন, আমাদের স্বভাবই হল মানুষকে বিভাজিত করে ফেলা কিংবা সহজেই পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে জাতিবিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া আর তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। সময় এসে গেছে, যখন মানুষকে বলতে হবে এইসব কাজ শুধু তাদের জীবনেই নয়, সারা পৃথিবীতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আমি অনুভব করেছি যে ছবি মানুষকে বদলে দিতে পারে। যদিও সেটা খুব আস্তে আস্তে – তা সত্ত্বেও ছবি দর্শকদের মনে প্রভাব ফেলবেই। তাই যারা ছবি বানান, তাদের এখন ইতিবাচকতা আর মিলনের কথা ছড়িয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। ‘মাটি’র মধ্যে সেটা আছে।
• ‘মাটি’-র জামিল কি বাস্তবের আদিলের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়?
হ্যাঁ, জামিল অনেকটাই আমার মতো। ছোটবেলা থেকেই আমার ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন, ইচ্ছে ছিল নিজের দেশটা ঘুরব, এমনকি অন্য দেশে গিয়ে থিতু হব। সেটা করেওছিলাম। ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা (এনএসডি)-র থেকে স্নাতক হওয়ার পর আমি লন্ডনের ড্রামা স্টুডিওতে ছ’মাসের জন্য অভিনয়ের কোর্স করতে গেছিলাম। ১৯৯৭-এ আমস্টারডাম কেন্দ্রিক ইন্টারন্যাশানাল ডান্সথিয়েটার কোম্পানির একটা প্রযোজনায় অন্যতম প্রধান চরিত্রে আমাকে নেওয়া হল। পরে আমি নিউ আমস্টারডাম থিয়েটারে শিল্পনির্দেশক হওয়ার প্রস্তাব পেয়েছিলাম। সেটা ছিল আমার স্বপ্নের অফার। কিন্তু আমি ‘না’ বলে দিলাম। কারণ, আমি ততদিনে বুঝে গেছি যে নিজের দেশকে আমি অনেক বেশি ভালোবাসি। ভারত আমার ডিএনএ-র মধ্যে রয়েছে আর এখানে আমাকে ফিরতেই হবে। আমার মতো জামিলও বিদেশে থাকার সুযোগ পেয়েছিল, এবং সেও বুঝেছিল যে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া তার কাছে অর্থহীন। আমেরিকার থেকে বাংলাদেশেরই তাকে প্রয়োজন বেশি। তার সাথে পাওলির দেখা হয়। পাওলি বাংলাদেশ ঘুরতে এসেছে এবং নিজের তেতো পারিবারিক অভিজ্ঞতার কারণে ওই দেশকে সে একেবারেই পছন্দ করে না। যদিও ধীরে ধীরে জামিল তাকে বাংলাদেশের সাথে একাত্ম করে তোলে।
• আপনার কাছে ‘বাংলা’ কীসের সমার্থক?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছোটবেলা থেকেই তিনি আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রত্যেক সকালে বাবা রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে শোনাতেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনাতেন। আমি দেবব্রত বিশ্বাসের খুব ভক্ত ছিলাম (এই বলে হঠাৎ গেয়ে উঠলেন, “ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু”)। মনে আছে, স্কুলে একবার রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রতিযোগিতায় আমি দ্বিতীয় হয়েছিলাম। তাই আমার কাছে বাংলা মানেই রবীন্দ্রনাথ আর ‘বায়োস্কোপওয়ালা’ ছবিতে আমার নাম রবি বসু, যে ছবিটা আবার ‘কাবুলিওয়ালা’র রূপান্তর। জীবন আসলে একটা বৃত্ত।
• আপনি তো প্রথম ১৯৭৫ সালে কলকাতা এসেছিলেন...
হ্যাঁ, তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়তাম। দাদার সঙ্গে এখানে এসেছিলাম। এসপ্ল্যানেডের কাছাকাছি একটা মাড়োয়ারি ধর্মশালায় উঠেছিলাম। আপনি তো জানেনই, আমি এসেছিলাম আসামের একটা ছোট্ট শহর থেকে, যার নাম গোয়ালপাড়া। এত বড়ো শহরটাকে তখন বেশ সম্ভ্রমের চোখে দেখতাম। মনে আছে, দাদাকে না জানিয়ে একদিন বিকেলের পর আমার এক বন্ধুর সঙ্গে রাত্রি পর্যন্ত কলকাতা আবিষ্কার করতে বেরিয়েছিলাম। তখন সবকিছুকেই জীবনের থেকে বড় মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল কলকাতা আমায় গিলে ফেলেছে (হাসি)।
আরও পড়ুন
জাদু-বাস্তবতার ‘রেনবো জেলি’
• তারপর সেই শহরেই বারবার ফিরে এলেন...
একদম। কলকাতা আমাকে প্রেরণা জুগিয়েছে এবং প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা হওয়ার জ্বালানি দিয়েছে। ১৯৭৫-এর পর আবার কলকাতায় এলাম ১৯৮৫তে। তখন আমি ‘ভায়া মামা’ নামে অসমের একটা স্ট্যান্ড আপ কমেডি গ্রুপে যোগ দিয়েছি। সেই গ্রুপ থেকে ঊষা উত্থুপজি’র স্টুডিওতে অডিও ক্যাসেট রেকর্ড করতে আমাকে কলকাতায় আসতে হত। তারপর যখন অসমের ছবিতে কাজ করা শুরু করলাম তার সম্পাদনা এবং অন্যান্য প্রয়োজনে বারবার কলকাতায় এসেছি। মনে পড়ছে, বিখ্যাত চিত্রসম্পাদক মহাদেব শি’র সাথে দেখা করেছিলাম। আমি রাসেল স্ট্রিটের অসম হাউজে থাকতাম আর সেই রাস্তার কোণে পাঞ্জাবি ধাবাতে চা আর খাবার খেতে যেতাম। ওই সময়েই আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস, শিশির মঞ্চ, গিরিশ মঞ্চ, তপন থিয়েটার এবং আরও অনেক জায়গাতে নাটক দেখা শুরু করেছিলাম।
• কবে আপনাকে পরিচালকের চেয়ারে দেখা যাবে?
পরিচালক হওয়া মোটেও সহজ কাজ নয়। এতে প্রচুর দায়িত্ব আর অনেক পরিশ্রম। অনেক প্রযোজকই আমাকে এই প্রশ্ন করেছেন, এমনকি তাঁরা বিনিয়োগ করতেও প্রস্তুত, কিন্তু আমি মনে করি না যে পরিচালকের চেয়ারে বসতে প্রস্তুত হয়েছি। অন্তত এখনও পর্যন্ত হইনি।
• একটু আগে জানালেন যে আপনি একটি স্ট্যান্ড-আপ কমেডি গ্রুপের মেম্বার ছিলেন? এমন কী ঘটনা ঘটল যে আপনি সিরিয়াস চরিত্রে অভিনয় করা শুরু করলেন?
সেটা আমিও বলতে পারব না। এই বিষয়ে আপনি বরং পরিচালকদের জিজ্ঞাসা করতে পারেন। হয়ত আমাকে দেখে খুব সিরিয়াস লোক মনে হয় (হাসি)। একমাত্র ড. চন্দ্রপ্রকাশ দ্বিবেদী আমার কমেডিয়ান সত্তাকে বুঝেছিলেন এবং তাঁর পরিচালনায় আমি জেড প্লাসে অভিনয় করেছি। তাঁকে কারণ জিজ্ঞাসা করায় তিনি ওঁর ‘শুদ্ধ’ হিন্দিতে জবাব দিয়েছিলেন, সৎভাবে সিরিয়াস চরিত্রে অভিনয় করতে পারলে, সত্যনিষ্ঠভাবে কমিক চরিত্রও ফোটাতে পারব।
• অসম থেকে আমস্টারডাম, বলিউড থেকে হলিউড, এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ছবিতে এত ভালো কাজ করার পরও আপনি এত বিনয়ী থাকেন কীভাবে?
ভাগ্যক্রমে আমি জীবনে বেশকিছু আদ্যন্ত প্রতিভাবান অথচ অহংকারহীন কয়েকজন শিক্ষক পেয়েছি, যাঁরা আমাকে অভিনয়ের পাশাপাশি জীবনের পাঠও দিয়েছেন। আপনাকে খালিদ তায়েবজি’র কথা বলতে পারি, যিনি এনএসডি’তে আমার শিক্ষক ছিলেন। স্টিফেন স্পিলবার্গ যখন ‘জুরাসিক পার্ক থ্রি’ বানাচ্ছেন, তখন স্পিলবার্গের থেকে তায়েবজি একটা অফার পান। কিন্তু তায়েবজি সেটা নেননি, কারণ তিনি তখন এই বাংলাতে প্রখ্যাত গৌর খ্যাপার কাছে গুবগুবি বাজানো শিখছিলেন। তিনি মনে করতেন, তাঁর নিজের দায়বদ্ধতাকে সম্মান না জানালে ভুল করা হবে। ভেবে দেখুন! আমি পন্ডিচেরিতেও এমন একজন শিক্ষক পেয়েছি, যিনি সেখানকার অরবিন্দ আশ্রমে থাকেন। তাঁর নাম প্রকাশ করতে পারব না। কিন্তু তিনিও সেই বিনম্র মানুষদের একজন যাঁরা আজও আমার কাছে উদাহরণ। আমি নিজেও একজন নাট্যশিক্ষক এবং শিক্ষকদের থেকে যেগুলো শিখেছি তা আমার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করি।