অমর্ত্য ভট্টাচার্যের হাত ধরে গোদারের ‘কৌলিন্য’ ভাঙলো ‘অ্যাদিউ গোদার’

যেঅনুসন্ধান কিংবদন্তি ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক জাঁ-লুক গোদার শুরু করেছিলেন ষাটের দশকে, সেই খোঁজ, সেই বিশ্লেষণ তিনি আজীবন জিইয়ে রেখেছিলেন। তিনি আবিশ্বের চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কাছে ‘শিক্ষক’ এই কারণেই যে চিরাচরিত ফর্ম-কে নসাৎ করে দেওয়া সেই অনুসন্ধানের বীজ তিনি ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। এবং সেই বীজেরই ফসল বলা চলে অমর্ত্য ভট্টাচার্যের (Amartya Bhattacharya) এই ছবিকে। যাঁরা এতদিন মনে করতেন ‘গোদার’ একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর দর্শকের জন্য, অমর্ত্য দায়িত্ব নিয়ে সেই ‘কৌলিন্য’ ভেঙেছেন। এর থেকে সমুচিত ‘ট্রিবিউট’ গোদারের জন্য আর কী বা হতে পারে!
KIFF-এর ২৭তম সংস্করণে জায়গা করে নিয়েছিল বহু বাংলা ছবি। তালিকা দেখলে বোঝা যাবে অন্যান্যবারের তুলনায় বাঙালি পরিচালকদের সংখ্যা অনেকটাই বেশি ছিল। মাস্টাররা তো রয়েছেনই, পাশাপাশি বেশ কিছু স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ছবিও দেখা গিয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ সব বিভাগে। ছবিগুলি বাংলা ছাড়াও বিভিন্ন ভাষায় নির্মিত। তার মধ্যেই অন্যতম ওড়িয়া ভাষায় নির্মিত কমেডি জঁরার ছবি ‘অ্যাদিউ গোদার’ (Adieu Godard)। চলচ্চিত্র উৎসবে ভারতীয় ভাষায় সেরা ছবির পুরস্কারও জিতে নিয়েছে ছবিটি।
‘অ্যাদিউ গোদার’-এর দৃশ্য ১
অমর্ত্য’র ছবিতে গোদার রয়েছেন। আমার মতে যেভাবে তাঁর থাকা উচিত, সেভাবেই রয়েছেন। ছবির গঠন ও বিষয়বস্তুই এই ছবির পাথেয়। গল্প আবর্তিত হয় আনন্দ নামের এক ব্যক্তিকে কেন্দ্রে রেখে। যে পর্নোগ্রাফি দেখতে পছন্দ করে, লুকিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বসে পর্নোগ্রাফি দেখে। তাদের হাতে কোনওভাবে গোদারের একটি ছবির ডিভিডি চলে আসে। গল্পের প্রেক্ষাপট এটাই এবং এরপর যা যা ঘটে গোদারের সিনেমাকে কেন্দ্র করেই। ছবিতে গোদারের আগে ‘অ্যাদিউ’ কেন আছে, এখানেই অন্তর্নিহিত আছে ছবির মূল বক্তব্য।
দৃশ্য ২
বের্তোলুচি, ওশিমা, রোশা, এমনকি মৃণাল সেনও গোদার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, আপনিও কি তাই? “প্রভাবিত বললে ঠিক বলা হবে না। তার চেয়ে এটা বলা উচিত হবে, যেসব পরিচালকরা আমার সবচেয়ে প্রিয়, তাঁদের মধ্যে গোদার অন্যতম। আরও স্পষ্ট করে বললে, আমার পছন্দের একেবারে শীর্ষস্থানেই রয়েছেন গোদার। আমি অনেক পরে গোদারের ছবি দেখেছি বা ওয়ার্ল্ড সিনেমার সঙ্গে আমার পরিচয়। আসলে, ছোটোবেলায় সেভাবে সুযোগ পাইনি এবং আমার ধারণাও ছিল না বিশ্ব-সিনেমা সম্পর্কে। আমি একেবারেই ‘ফিল্ম-বাফ’ ছিলাম না। নিজের ছবি বানানোর পর আমি বিশ্ব-চলচ্চিত্রের ছবি দেখতে শুরু করি, কাজেই প্রভাবিত হওয়ার কোনও জায়গা ছিল না।” বলেন অমর্ত্য।
ক্রিকেট খেলতেন, কবিতা লেখেন, অভিনয়ও করেন, সেখান থেকে পরিচালনায় ফোকাস করলেন কেন? অমর্ত্য’র কথায়, “সিনেমা মাধ্যমটা আমার ভালো লাগতো না, তার কারণ হল- টেলিভিশন বা সিনেমা হলের মাধ্যমে যেধরনের ছবি আমাদের কাছে পৌঁছাতো, সেই ছবিগুলোর আমি খুব একটা ভক্ত ছিলাম না। সেই সময় জীবনানন্দ দাশ বা সুকুমার রায়ের কবিতা, দালি’র পেন্টিং, থিয়েটার আমাকে বেশি আকৃষ্ট করতো। আমি পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, চাকরিসূত্রে যখন বাইরে চলে যাই তখন থিয়েটারে অভিনয়, কবিতার বই-প্রকাশ এগুলো বন্ধ হয়ে যায়। তখন আমার এমন একটা মাধ্যমের প্রয়োজন ছিল যেটা আমার শিল্প-সত্ত্বাকে একটু হলেও শান্তি দেবে এবং তখনই মনে হয়েছিল সিনেমা মাধ্যমেই সেটা সম্ভব। কারণ থিয়েটারে ফুল-টাইম থাকার মতো অবসর চাকরি করে পেতাম না, আর সিনেমা সময় নিয়ে ভেঙে ভেঙে করা যায়।”
দৃশ্য ৩
৮৩ মিনিটের ‘অ্যাদিউ গোদার’-এ বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন- বিকাশ দাস, দীপান্বিত দাস মহাপাত্র, জয়প্রকাশ দাস, শঙ্কর বসু মল্লিক, অভিষেক গিরি প্রমুখ। ছবির চিত্রনাট্য, সিনেমাটোগ্রাফি, সম্পাদনায় অমর্ত্য ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন কিশলয় রায়চৌধুরী। প্রযোজনায় স্বস্তিক চৌধুরী। উল্লেখ্য, অমর্ত্য একজন রাজ্য এবং জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র পরিচালক। একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি।
অমর্ত্য ভট্টাচার্য
অমর্ত্য ২০১০ সালে পেশাসূত্রে ভুবনেশ্বর যান। ‘বোবা মুখোশ’, নিলয় যখন’ এই বাংলা ছবিগুলো তখন বানিয়ে ফেলেছেন। ছবিগুলো বানানোর পরে তাঁর মনে হয়েছিল বাঙালিরা তাঁর ছবি গ্রহণ করছে না বা সহযোগীতা করছেন না। সেই অভাব পূরণ হয় ওড়িশায়। তাঁর তৈরি বাংলা ছবি নিয়ে ভুবনেশ্বর শহরের মানুষ, ওড়িয়া সংবাদমধ্যম প্রচুর মাতামাতি করেন—আলোচনা করেন, ছবিগুলো মন দিয়ে দেখেন। এটা তাঁকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে। ওড়িশায় থেকে সেখানকার ভাষাও শিখে যান এবং সে ভাষায় ছবি তৈরি করতে শুরু করেন।
অমর্ত্য’র কথায়, “উড়িষ্যার মানুষ, প্রকৃতি সবই আমার ভালো লাগে। যেখানকার মানুষরা আমাকে ভালোবাসলেন, কর্মসূত্রে যেখানে থাকি আমি, যে শহরটাকে আমার ভালোলাগে, সে জায়গার ভাষায় ছবি কেন বানাবো না! এই ভাবনা থেকেই ওড়িয়া ভাষায় আমার প্রথম ছবি ‘ক্যাপিটাল-I’ বানাই। ক্ষণিকা একমাত্র ওড়িয়া ছবি যেটা ৪৮তম IFFI-তে দেখানো হয়েছিল এবং সম্পাদনার জন্য ওড়িয়া স্টেট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড-ও পেয়েছি। ‘অ্যাদিউ গোদার’-ও ওড়িয়া ভাষায় বানিয়েছি। তবে, শেষপর্যন্ত আমার মাতৃভাষা তো বাংলা, তাই বাংলা ভাষাতেও অনেক ছবি বানিয়েছি, যেমন- ‘রুনানুবন্ধ’, ‘কেতু’। এই মুহূর্তে একটা বাংলা ছবিরই কাজ করছি। আর সেভাবে দেখতে গেলে যে প্রেক্ষাপটে ছবিটা তৈরি হচ্ছে, তার উপর ভিত্তি করেই সংলাপের ভাষা নির্দিষ্ট করতে হয়। আমরা যখন অন্য কোনও দেশের ছবি দেখি, বুঝতে তো কোনও অসুবিধা হয় না। সিনেমা তো একসময় নির্বাকই ছিল! ভাষার সঙ্গে তো সিনেমা নির্মাণের তেমন সম্পর্ক নেই।”
‘অ্যাদিউ’ মানে Good Bye, বিদায়। ১৩ সেপ্টেম্বর গোদার স্বেচ্ছায় বিদায় জানিয়েছেন আমাদের। ‘গুড বাই টু ল্যাঙ্গোয়েজ’(২০১৪) বানানোর পর ‘ইমেজ বুক’ (২০১৮) বানান তিনি। বিগত বছরে দুটি ছবিই কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে ঘুরে গেছে। ছবি দুটি যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানবেন, এই ছবি দুটিতে গোদার ভাষাকে বিদায় জানিয়ে আমাদের জানাচ্ছেন যে, আজকের বুদ্ধিজীবীরা ক্ষমতা এবং অর্থ, সেই সঙ্গে খ্যাতি— এ সবেরই দাসত্ব করছেন। তাই, এই অধুনান্তিক পৃথিবীতে, বুদ্ধিজীবীদের বাণীর জন্য অপেক্ষা করার কোনও মানে আছে কি? অমর্ত্যর 'অ্যাদিউ গোদার'-এও এই প্রশ্নটি নিহিত আছে। এবং সেকারণেই বোধহয় ছবির প্রোটাগনিস্ট পর্নের বদলে বেছে নেয় গোদার।