রেসিপি লুকোতে রাত্তিরে মিষ্টি তৈরি করতেন অধরচন্দ্র দাস

উত্তম-সুচিত্রা জুটির জনপ্রিয় ছবি ‘সবার উপরে’। ছবি বিশ্বাস সেখানে ডায়লগ বলছেন, “আমার কুড়িটা বছর ফিরিয়ে দাও”। জায়গাটা কৃষ্ণনগর। অধরচন্দ্র দাসের মিষ্টির দোকান। সরভাজা আর সরপুরিয়া বলতেই বাঙালির যে দোকানকে মনে পড়ে। কৃষ্ণনগরের পাঁচটি প্রধান দ্রষ্টব্য স্থানগুলোর মধ্যে রাজবাড়ি, ঘূর্ণি, ক্যাথলিক চার্চ আর কলেজের সঙ্গে এখন ‘অধর মিষ্টান্ন প্রতিষ্ঠান’-ও জায়গা করে নিয়েছে। অবশ্য দ্রষ্টব্য শব্দটা অধরের ক্ষেত্রে আদৌ যুতসই কিনা তা বলা কঠিন। কারণ, মানুষ সেখানে চোখের আকর্ষণে যায় না, জিভের টানে যায়। গোটা কৃষ্ণনগর ঘুরে দেখার পর ফেরার আগে বাড়ির জন্য অধর থেকে বাক্স ভর্তি সরভাজা-সরপুরিয়া নেওয়া মাস্ট। বাঙালি তো বটেই, এখন বিশ্বায়নের গুণে সারা পৃথিবীতেই অধরের জয়জয়কার। এখানকার সরভাজা-সরপুরিয়া তো এখন বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেই, তার পাশাপাশি ক্ষীরপুলি, নিখুতি, শ্রীমতী, রসকদম্ব, রোলক্রিম, কাঁচাগোল্লা, ছানার মুড়কি, ব্যানাক ডায়মন্ডের মতো বিভিন্ন মিষ্টি আর নোনতা খাবারও বেশ জনপ্রিয় এখন।
তবে সরভাজা-সরপুরিয়ার জন্যই অধরের বিশেষত্ব। যদিও এই মিষ্টির প্রাচীনত্ব নিয়ে বিতর্ক আছে। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে চৈতন্যদেব তিন ধরনের সরের মিষ্টি খেতেন, তার একটি ছিল সরপুপী বা সরপুরিয়া। এর উল্লেখ আছে কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃত’-তে। অদ্বৈত আচার্য নাকি চৈতন্যদেবকে নিজের হাতে সরপুরিয়া খাওয়াতেন। আবার অনেকে মনে করেন, কৃষ্ণনগরের অধরচন্দ্র দাসই সরপুরিয়ার আবিষ্কর্তা। যদিও কারো কারো মতে অধরচন্দ্রের বাবা সূর্যকান্ত দাস প্রথম এই মিষ্টি তৈরি করেছিলেন। শোনা যায়, তিনি রেসিপি চুরি যাওয়ার ভয়ে রাতে দরজা বন্ধ করে সরভাজা আর সরপুরি তৈরি করতেন আর পরের দিন সকালে মাথায় নিয়ে ফেরি করতেন সেগুলো। তাঁর ছেলে অধরচন্দ্র সরভাজা আর সরপুরিয়ার রেসিপি শিখে নেন বাবার কাছ থেকে। ১৯০২ সালে তিনি কৃষ্ণনগরের নেদের পাড়ায় নিজের মিষ্টির দোকান খুলে বসেন। অধরচন্দ্রও বাবার মতো গোপনে রাত্তিরবেলা সরভাজা-সরপুরিয়া বানাতেন। কিন্তু মিষ্টি তৈরির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত গোটা অঞ্চলে। গন্ধের টানে মৌমাছির দল গুনগুন করত গোটা বাড়িতে। এই গোপনতা বেশিদিন বজায় থাকেনি। এক সময়ে সরভাজা-সরপুরিয়ার ফরমুলা লিক হয়ে যায়। তারপর আসেপাশের অন্যান্য ময়রার দোকানেও এই মিষ্টি তৈরি হতে থাকে।
সরপুরিয়াতে থাকে ছানা, দুধের সর, ক্ষীরের সঙ্গে কাঠবাদাম, পেস্তা, ছোটো এলাচ আর চিনি। খাঁটি দুধ অনেকবার জ্বাল দিয়ে তার ঘন সরকে একের পর এক স্তরে রাখা হয়। সেই মোটা সরকে তারপর ঘিয়ে ভেজে তার ওপর খোয়া ক্ষীর, কাঠবাদাম, পেস্তা, এলাচ ছড়িয়ে আবার এক স্তর সর রাখা হয় তার ওপর। সব শেষে চিনি মেশানো দুধে রাখা হয় তাকে। সরভাজা তৈরিতেও দুধের সর, ক্ষীর আর চিনি লাগে। চৈতন্যদেবের সময় আখের রস জ্বাল দিয়ে তার থেকে তৈরি টাটকা চিনি থেকে এগুলো তৈরি হত বলে জানা যায়। সম্পতি কৃষ্ণনগরের মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী ওয়েলফেয়ার সোসাইটির তরফে এই দুই মিষ্টির জিআই রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। যাই হোক, অধরচন্দ্রের দোকান একশো বছরের বেশি সময় ধরে রমরমিয়ে চলছে। অধর দাসের ছেলে জগবন্ধু দাস বাবার পর দোকানের হাল শক্ত হাতে ধরেছিলেন। তাঁর ছেলে গৌতম দাস পেশায় উকিল হলেও দক্ষতার সাথে দোকানের সুনাম বজায় রেখেছেন। ক্রেতাদের চাহিদা এবং রুচির কথা মাথায় রেখেই অধরচন্দ্র দাসের দোকান মিষ্টি এবং নোনতা খাবারের গুণগত মান ধরে রেখেছে এখনও।
তথ্যসূত্র-
bangla.yourstory.com, আমাদের রাঙামাটি, খবর অনলাইন