আবোল তাবোল-এর আড়ালে লুকোনো সুকুমারকে প্রকাশ্যে আনলেন প্রবাসী অনুবাদক

‘সিংহাসনে বসল রাজা বাজল কাঁসর ঘণ্টা,
ছটফটিয়ে উঠল কেঁপে মন্ত্রীবুড়োর মনটা৷
বললে রাজা, মন্ত্রী তোমার জামায় কেন গন্ধ?
মন্ত্রী বলে, এসেন্স দিছি - গন্ধ তো নয় মন্দ!’
উপরের লাইনগুলি যে ‘গন্ধ বিচার’ কবিতার, তা বোধ করি বলার প্রয়োজন নেই। আবোল তাবোল নামক রত্নখনির অন্যতম একটি রত্ন। যদিও এই খনির সৃষ্টিকর্তা সুকুমার রায়কে উদযাপন করার কোনও বিশেষ দিন হয় না, হতে নেই। পিতা উপেন্দ্রকিশোর এবং পুত্র সত্যজিৎ-এর মতোই তিনি ‘পলিম্যাথ’, আক্ষরিক অর্থেই বহুমুখী প্রতিভা। তাই তিনি বিরল, বিশেষভাবে প্রিয়, বাঙালির চিরকালীন অহঙ্কার।
এই লেখার বিষয়বস্তু অবশ্য শুধুমাত্রই আবোল তাবোল (যা শতবর্ষ পূর্ণ করলো), বা খুব নির্দিষ্ট ভাবে বলতে গেলে, আবোল তাবোল-এর নেপথ্য কাহিনি, যা আমাদের শোনাচ্ছেন সান ফ্রান্সিসকো নিবাসী শিবপুর বিই কলেজের একদা ছাত্র নীলাদ্রি রায়। পেশায় ইন্টেল সংস্থায় কর্মরত ইঞ্জিনিয়ার, নেশায় পর্বতারোহী এবং ফটোগ্রাফার, এবং অবশ্যই সুকুমারে মগ্ন ভক্ত। আজ থেকে বছর দুয়েক আগে কিলিমাঞ্জারো পর্বতের শিখরেও পা রাখেন তিনি, কিন্তু সে গল্প আরেকদিন শোনানো যাবে।
বক্তব্যে ফিরে জানাই, ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় নীলাদ্রি বিরচিত ‘Rhymes of Whimsy - The Complete Abol Tabol’, আবোল তাবোল-এর ৫৩টি কবিতা ও অনু কবিতার প্রথম সম্পূর্ণ ইংরেজি অনুবাদ। এই বইয়ের দ্বিতীয় ভাগেই কবিতাগুলির নেপথ্য কাহিনি লিপিবদ্ধ করেছেন নীলাদ্রি, এবং এই দ্বিতীয় ভাগের তাঁরই করা বাংলা অনুবাদ শিগগির প্রকাশিত হবে বলে আশা করছেন তিনি।
এই নেপথ্য কাহিনি কিন্তু যে সে কাহিনি নয়, রীতিমত গভীর তত্ত্ব, যা সুকুমার গবেষণার অনেক নতুন দিক খুলে দিতে পারে। গন্ধ বিচার=এর কথাই ধরা যাক। আজ থেকে ১০০ বছর আগে, ১৯২২ সালে ব্রিটেনে এক মহা কেলেঙ্কারির ফাঁদে পড়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ-এর লিবারেল পার্টি শাসিত সরকার। জানা যায়, দলীয় তহবিলের জন্য টাকা তোলার স্বার্থে রাজার দেওয়া উপাধি অথবা ‘অনার্স’ বিক্রি করছেন মন্ত্রীসভার সদস্যরা, অবশ্যই লয়েড জর্জের অনুমতি অনুসারে। এখন কথা হচ্ছে, এই উপাধি বিক্রির প্রথা ব্রিটেনে চলে আসছে কয়েক শতক ধরে, মূলত নব্য বড়লোকদের উপাধি পাইয়ে দেওয়ার উপায় হিসেবে। কিন্তু এত খোলাখুলি, এবং এমন নিখুঁত পদ্ধতি মেনে বিক্রি, বহুকালের মধ্যে দেখেনি কেউ। নাইটহুড চাইলে ১০ হাজার পাউন্ড, ব্যারোনেট হতে গেলে ৩০ হাজার পাউন্ড, এবং উচ্চতর উপাধির ক্ষেত্রে ৫০ হাজার পাউন্ড, একেবারে রেট বেঁধে দিয়েছিলেন লয়েড জর্জ এবং তাঁর মন্ত্রীরা। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে তাঁর প্রধানমন্ত্রীকে ডেকে পাঠান রাজা পঞ্চম জর্জ, এবং শেষমেশ লিবারেল সরকারের পতন ঘটায় এই ‘অনার্স স্ক্যান্ডাল’।
নীলাদ্রির বক্তব্য, গন্ধ বিচার কবিতার নেপথ্যে ছিল এই কেলেঙ্কারি। “এমনও জানা যায় যে শুধুমাত্র টাকা তুলতেই তৈরি করা হয় ‘অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ উপাধিটি, এবং অপেক্ষাকৃত সস্তায় বিক্রি হওয়ার ফলে চার বছরের মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার প্রাপক জুটে যান,” সান ফ্রান্সিসকো থেকে হাসতে হাসতে ফোনে জানান নীলাদ্রি। “এই স্ক্যান্ডালের গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ার পর মন্ত্রীদের কাছে কৈফিয়ত তলব করেন রাজা, কিন্তু কেউই সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেন না, ঠিক যেমন গন্ধ বিচার-এ আছে। সারা দেশে শোরগোল পড়ে যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী পদে বসেন ‘Chancellor of the Exchequer’ বা ধনাধক্ষ্য অ্যান্ড্রু বোনার-ল (Andrew Bonar-Law), যাঁকে কবিতায় ‘বৃদ্ধ নাজির’ বলেছেন সুকুমার।”
এই ধরনের গোপন সঙ্কেত লুকিয়ে আছে আবোল তাবোল-এর প্রায় প্রতিটি কবিতায়, বলছেন নীলাদ্রি। “আবোল তাবোল অনুবাদ করতে শুরু করে দুটো জিনিস বুঝতে পারি - এক, এগুলি নিছকই বাচ্চাদের কবিতা নয়। দুই, প্রত্যেকটা কবিতায় রয়েছে কিছু লুকোনো ইঙ্গিত এবং বার্তা। এখন ৫৩টির মধ্যে ৩৯টি কবিতার নির্দিষ্ট তারিখ ততদিনে পেয়ে গেছি আমি, সুতরাং মনে হলো, খুঁজে দেখি তো সমসাময়িক কোনও ঘটনার কথা পাই কিনা, যা কবিতার বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিলে যায়।”
আবোল তাবোল-এর কবিতাগুলির যে গূঢ়তর অর্থ থাকতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা চলছিল বিগত অনেক বছর ধরেই, তবে নীলাদ্রির গোয়েন্দাগিরি যে এই তত্ত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তাঁর বাংলা অনুবাদের শীর্ষক ‘আলোয় ঢাকা অন্ধকার’, যা পাওয়া যায় আবোল তাবোল-এর শেষ কবিতায়: ‘আলোয় ঢাকা অন্ধকার, ঘণ্টা বাজে গন্ধে তার/ গোপন প্রাণে স্বপন দূত, মঞ্চে নাচেন পঞ্চ ভূত!’ এখানে নীলাদ্রির বক্তব্য, সুকুমার বলতে চেয়েছেন যে স্যাটায়ার বা ব্যাঙ্গের ‘অন্ধকার’ ঢাকা পড়েছে হাস্যরসের ‘আলোয়’। তা ছাড়াও কবিতাটির অন্তর্নিহিত বার্তা রয়েছে, যা সম্পর্কে বইয়ের মুখবন্ধে বিশদে লিখেছেন নীলাদ্রি।
কেন এই পন্থা অবলম্বন করেছিলেন সুকুমার? সবচেয়ে সহজভাবে বলতে গেলে, ঔপনিবেশিক বিরোধী ব্যঙ্গাত্মক বার্তা লুকিয়ে রাখার পক্ষে আপাতদৃষ্টিতে শিশুদের জন্য লেখা আজগুবি কবিতার চেয়ে ভালো ছদ্মবেশ আর কী হতে পারে? উনিশ শতকের প্রথমদিকে “দেশদ্রোহী এবং বিধ্বংসী” লেখালিখি সম্পর্কে সদা সতর্ক ব্রিটিশ সরকার, সুতরাং সরাসরি বিরোধিতা করলে সেন্সরশিপের কবলে পড়তে হবেই। অতএব আবোল তাবোল, যার ছত্রে ছত্রে পাঠকের জন্য সঙ্কেত রেখে গেছেন কবি, যার ফলে গোপন বার্তার পাঠোদ্ধার সঠিকভাবে করা গেছে কিনা, তা সহজেই বোঝা যায়।
যাঁরা বইটি পড়তে চান, তাঁদের কথা মাথায় রেখে খুব বেশি উদাহরণ না দিয়েও দু-তিনটি কবিতার কথা না বললেই নয়। প্রথমে ধরুন ‘ডানপিটে’-র কথা। এর নেপথ্যে রয়েছে ভার্সাই চুক্তি (১৯১৯), এবং সেই চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী জর্জেস ক্লেমসোঁ, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ, এবং মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্র উইলসন (কবিতায় বর্ণিত ‘টম চাচা’)-এর আদর্শগত সংঘাত। সকলের জ্ঞাতার্থে জানাই, বাংলার সঙ্গে বিশেষ যোগ ছিল এই চুক্তির, যেহেতু ভারতের পক্ষে স্বাক্ষর করার জন্য লর্ড সত্যেন্দ্র প্রসন্ন সিনহাকে মনোনীত করে ব্রিটিশ সরকার, যদিও তিনি সবিনয়ে এই মনোনয়ন প্রত্যাখ্যান করেন।
আবার ধরা যাক ‘একুশে আইন’-এর কথা। পণ্ডিতেরা এযাবতকাল বলে এসেছেন, ব্রিটিশ প্রশাসনকে ব্যঙ্গ করেই লেখা এই কবিতা, কিন্তু এই ধারণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন নীলাদ্রি। তাঁর মতে, যে কোনও আইন নয়, ১৯১৯ সালে প্রণীত কুখ্যাত রাওলাট আইনের বিরোধিতা করছে ‘একুশে আইন’। আবার ‘পালোয়ান’ কবিতায় রয়েছে ১৯২২ সালে প্রয়াত প্রখ্যাত বাঙালি কুস্তিগির ভীম ভবানী ওরফে ভবেন্দ্রমোহন সাহার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি, যিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান মাত্র ৩৩ বছর বয়সে। তার পরের বছরই ভবেন্দ্রমোহনের অনুগামী হন সুকুমার স্বয়ং। বয়স তখন সবে ৩৫, ‘লেইশমানিয়াসিস’ নামক এক প্রবল ছোঁয়াচে জ্বরের কবলে পড়েন তিনি, যার কোনও চিকিৎসা তখন ছিল না। রেখে চলে যান দু’বছরের সত্যজিৎ এবং বিধবা সুপ্রভাকে।
আজ প্রায় এক শতাব্দী পর প্রকাশিত হলো আবোল তাবোল-এর প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি অনুবাদ। এই সংকলনের অধিকাংশ কবিতাই ১৯১৫ থেকে ১৯২৩-এর মধ্যে প্রকাশিত হয় ‘সন্দেশ’ পত্রিকায়, যা উপেন্দ্রকিশোর শুরু করেন ১৯১৩ সালে। “আবোল তাবোল-এর জন্য শুধুমাত্র দ্ব্যর্থক কবিতাই বেছেছিলেন সুকুমার”, বলছেন নীলাদ্রি। “স্রেফ তিনটি কবিতা - প্রথম এবং শেষ, দুটির নামই আবোল তাবোল, এবং গন্ধ বিচার - আলাদা করে লিখেছিলেন আবোল তাবোল-এর জন্য।”
প্রবাসী এক ইঞ্জিনিয়ারের দৌলতে সুকুমার রায়ের অসামান্য প্রতিভার আস্বাদ পাচ্ছে সারা বিশ্ব। এর পর? আর অনুবাদ করবেন কি? ধরুন পাগলা দাশু সিরিজ? দৃঢ়ভাবে না বলছেন নীলাদ্রি, কিন্তু আমরা বলি, ‘নেভার সে নেভার’।