No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    The Nachni Chronicles: নাচনিদের জীবন নিয়ে অভিজিৎ চক্রবর্তীর ফটোগ্রাফিক জার্নি

    The Nachni Chronicles: নাচনিদের জীবন নিয়ে অভিজিৎ চক্রবর্তীর ফটোগ্রাফিক জার্নি

    Story image

    সিক বিনা দুনিয়া আন্ধার হেঁ — শীলা নাচনির কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত খানিক অস্পষ্ট অথচ উদার এহেন উচ্চারণে জলসা বসেছে লাল মাটির সরানে। আর ললিত অঙ্গ জুড়ে নৃত্য। ভয়াবহ জীবনের সীমাহীন যন্ত্রণা থেকে আজ তাঁদের মুখে হাসি ফুটে ওঠা — নাচনিদের সুদীর্ঘ ইতিহাস এবং অন্যান্য নানান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রথাকে ফটোগ্রাফির মাধ্যমে দুই মলাটে ধরেছেন অভিজিৎ চক্রবর্তী – দ্য নাচনি ক্রনিকল্স (নাচনির উপাখ্যান – The Nachni Chronicles) গ্রন্থে।

    সরস্বতীদেবী

    সংস্কৃত ‘নৃত্য’ থেকে প্রাকৃত ‘নচ্চ’ হয়ে ‘নাচ’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত উদ্ভব, এ কথা কে না জানে! এই অঙ্গসঞ্চালনই নৃত্যের আজন্ম সঙ্গী। ‘নাচনি’ শব্দটি যে ‘নাচ’ জাত তা বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। তবে ‘নাচনি’ সম্প্রদায়কে জনপ্রিয় করে তুলেছে রাঢ় বাংলার পুরুলিয়া জেলা। আমরা জানি, দেবরাজ ইন্দ্রের রাজসভায় সুন্দরী নর্তকীদের নৃত্যের কথা। আমরা জানি বেহুলার নৃত্যকথা। তবে নাচনিদের নাচে একরকম স্বকীয়তা আছে। কিন্তু আজ থেকে কুড়ি বছর আগেও নাচনিদের জীবন দুর্বিষহ ছিল। মহাশ্বেতাদেবী লিখে গিয়েছেন, “পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়াতে নাচনি মেয়েদের মৃত্যু হলে, তাদের দাহ বা সমাধি হয় না। তার মৃতদেহ যায় ভাগাড়ে। বেজায় প্রগতিশীল মহিলারা, পঞ্চায়েত স্তর থেকে মহিলা কমিশন অবধি যাঁরা দাপটে লেকচার দিয়ে বেড়ান, তাঁদের মনের চোখে গ্লুকোমা। কেন না তাঁরা নাচনিদের ন্যূনতম মানবাধিকার দেওয়ার কথা ভাবেন না।”

    শীলাদেবী

    যদিও এখন জমানা বদলেছে। নাচনিরাও সুখের মুখ দেখেছেন ধীরে ধীরে। আজ যে নাচনিরা খুব আয়েশে আছেন তা নয়, কিন্তু দিনের শেষে লোকমুখে যখন নাচনিদের নাম ঘুরেফিরে আসে, তাতে শান্তির ঘুমে চোখ বুজে আসে। চোখ বুজলে রঙীন স্বপ্ন। যেখানে নাচনির শরীর জুড়ে নৃত্য। এই নাচনির কাছে তাঁর রসিক হচ্ছেন নোঙরের মতো। রসিককে আশ্রয় করেই তাঁর শিল্প বিস্তার এবং বেঁচে থাকা। ঘেন্না, অশ্রদ্ধা, অপমানও কম করেন না। নাচনিকে কখনও ‘পারফর্মিং আর্ট’ হিসেবে কোনোদিনই দেখা হয়নি। রাতের পর রাত ‘মেয়েছেলের সস্তা নাচ’ তকমাতেই থেকে গিয়েছে।

    পস্তুবালাদেবী

    এমন সব রোমকর্ষক কাহিনি বলছিলেন চিত্রগ্রাহক অভিজিৎ চক্রবর্তী। রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের অধীনে লোক ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র (Folk & Tribal Cultural Centre) থেকে প্রকাশিত হয়েছে অভিজিৎ চক্রবর্তীর ‘দ্য নাচনি ক্রনিকল্স’। ২০১৪ সাল থেকে পুরুলিয়া সদর শহর ও বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরে নাচনি ও রসিকদের সঙ্গে থেকে, কথা বলে তাঁদের জীবনযাত্রা ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে ডক্যুমেন্ট করেছেন ফটোগ্রাফির মাধ্যমে। বঙ্গদর্শন.কম-কে অভিজিৎ বলেন, “২০১৪ সালে আমার এক বন্ধুর কাজের সূত্রে নাচনি পস্তুবালা ও তাঁর রসিক বিজয় কর্মকারের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয়। প্রথম সাক্ষাতেই আমার অসম্ভব ভালো লেগে যায় তাঁদের। ওইদিনই কিছু ছবি তুলি। পরে রাজ্যের তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তরের সূত্রে নাচনিদের একটা পরিপূর্ণ তালিকা পাই। ২০১৮ সালে সাহাপিডিয়া ফ্রেমস ফটোগ্রাফি গ্র্যান্ট-এ (Sahapedia frames photography grant 2018) মনোনীত হই আমি। এর ফলে নাচনিদের নিয়ে এই ফটোগ্রাফিক জার্নি আরও গুরুত্ব পায়।”

    ৪৭তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় রাজ্যের লোক ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত হয়েছে অভিজিৎ চক্রবর্তীর ‘দ্য নাচনি ক্রনিকল্স’। ২০১৪ সাল থেকে পুরুলিয়া সদর শহর ও বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরে নাচনি ও রসিকদের সঙ্গে থেকে, কথা বলে তাঁদের জীবনযাত্রা ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে ডক্যুমেন্ট করেছেন ফটোগ্রাফির মাধ্যমে।

    অভিজিৎ আরও বলেন, “নাচনিদের ব্যবহার অমায়িক। সারারাত প্রোগ্রাম দেখে সকালে বেরিয়ে আসতাম। বর্তমান রাজ্য সরকারের কল্যাণে নাচনিদের অবস্থা বেশ ভালোই। তাঁরা এখন পেনশন পান, দেশে নানা অনুষ্ঠানের ডাক পান। তবে একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি, বিমলা পুরুলিয়ার বেশ বিখ্যাত নাচনি। সরকার থেকে তাঁকে পুরস্কৃত করা হয়। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, পুরস্কারের টাকায় তুমি কী করলে? বিমলা উত্তর দেন, নাতিকে বাইক কিনে দিয়েছি। এই ছোটো ছোটো সাংসারিক বোঝাপড়াগুলোই আমি ফটোগ্রাফির মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছি। নাচনিরা অনেকেই নিজেদের কাছে টাকা রাখতে পারেন না, কারণ ওঁরা রসিকের ছত্রছায়ায় থাকেন। নাচনিদের দাপট শুধুমাত্র মঞ্চে, ব্যক্তিগত জীবনে তাঁরা নিঃস্পৃহ।”

    তারাদেবী এবং তাঁর রসিক জগদীশ

    জানা যায়, নতুন প্রজন্মের প্রায় কোনো মেয়েই এই পেশায় আসে না। কারণ নাচনিদের এখনও প্রান্তিক ও অবহেলিত করেই দেখা হয়। সম্মান সে অর্থে নেই। এখন মোবাইল, ইন্টারনেটের যুগ। নাচনিদের জীবন খুব ছোটো হলেও, তাঁদের সন্তানদের পৃথিবীটা উন্মুক্ত করে দিয়েছে বিশ্বায়ন। তাই তাদের অন্যান্য পেশায় নিযুক্ত হওয়া সহজ হচ্ছে। ভারতের মতো যে দেশ উচ্চমার্গের শাস্ত্রীয় সংগীতের সাধনা করে, সেখানে নাচনিদের সংস্কৃতি প্রান্তিক হয়েই থেকে যায়। শুধুমাত্র মধ্যরাতের বিনোদন হয়ে থেকে যায় তাঁদের নাচ-গান।

    নাচনি পস্তুবালা বেশ কিছুদিন আগে কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ঝুমুর গানের ওয়ার্কশপ করিয়ে গেলেন। তবে যাই ঘটুক, রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-বিরহ বা আধুনিক জীবনযাপনকে মুখ্য উপজীব্য করে ঝুমুর গানকে কণ্ঠে তুলে নিলেও সারা বাংলার সাংস্কৃতিক মহল এই নৃত্যশিল্পকে কখনও আপন করে নেয়নি।

    অভিজিৎ চক্রবর্তী একজন স্ব-শিক্ষিত ফটোগ্রাফার। পেশায় দক্ষ গ্রাফিক ডিজাইনার। শখের ফটোগ্রাফিচর্চা অভিজিৎ করেন না, বরং ছবির মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেন গ্রামবাংলার মানুষের রোজনামচা, সূক্ষ্ম অনুভূতি – যা দেশকালের সীমানা পার করে নজিরবিহীন হয়ে ওঠে। অভিজিতের ফটোগ্রাফি প্রদর্শিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকি আন্তর্জাতিক স্তরেও। তিনি নানান এক্সজিবিশন কিউরেটও করেন। এসব কিছুর পরেও অভিজিতের আরেক ভালোলাগা গান লেখা।

    বিমলাদেবীর হাতে সংগীত মহাসম্মান ২০১৭

    অভিজিৎ চক্রবর্তী কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন সদাহাস্য নাচনি চারুবালা কালিন্দীর কথা। ৬৫ বছর পার করেও এখনও কমবয়সী নাচনিদের উৎসাহিত করেন। কাজল সিং সর্দারের বয়সও ৭০ ছুঁয়েছে। শরীরের চামড়া কুঁচকেছে, বলিরেখা স্পষ্ট, গলা কাঁপে – তা সত্ত্বেও চারুবালা-কাজলরা বন্ধু হয়ে থেকে যান। রসিকময় সে জীবনের এটুকুই সম্বল।

     

     

    প্রায় দুশো-র উপর ছবি রয়েছে অভিজিতের এই বইয়ে। ১৬০ পাতা জুড়ে রয়েছে নাচনিদের অবর্ণনীয় ইতিহাসের টুকরো ছবি ও ব্যক্তিগত দিনলিপি। গ্রন্থের শুরুতে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ – লাল শালুকের ফুল (Red Water Lilies and the Land), রূপ, রস আর মধুগন্ধ (A Photographic Revelation - পরিচালক সুদেষ্ণা রায়ের বয়ানে), বনমালী তুমি, পরজনমে হইয়ো রাধা (The Cultural Untouchables), হামার মনকে হরিলি (Journey of a Virtuoso – Sindhubala Devi), বাঈ নাচের মজা লুটেছে (Respect Denied), প্রেমের কথা রসিক নাগর জানে (Charubala Story)। নাচনিদের জীবনের মতোই এই গ্রন্থের জার্নিও এগিয়েছে নানান ঘটনা পরম্পরায়। বইয়ের শেষে রয়েছে পুরুলিয়ার ১২৯ জন নাচনি ও রসিকদের সম্পূর্ণ নাম, গ্রাম ও ব্লকের উল্লেখ। ৩০-৪০ বছর আগে নাচনি সম্প্রদায়ের পরিস্থিতি ছিল ভয়ংকর। নাচনি সিন্ধুবালাদেবী-র অধ্যায়ে রয়েছে অমানুষিক পরিস্থিতির মধ্যে যেভাবে তাঁকে দিন অতিবাহিত করতে হয়েছে, তার কথা। ১৯৯৫ সালে তৎকালীন রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর সিন্ধুবালাদেবীকে লালন পুরস্কারে ভূষিত করে।

    ছেপু কালিন্দীর সঙ্গে অভিজিৎ চক্রবর্তী

    দক্ষ হাতে বইয়ের লে-আউট করেছেন অভিজিৎ নিজেই। এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, “ছবির বইয়ের দেশজ সংস্করণগুলোতে দেখা যায়, পাতার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত যতটা সম্ভব ছবির সাইজ বড়ো করে ছবির সম্মান প্রতিষ্ঠার একটা চেষ্টা চলে। যতটুকু সাদা নিরাভরণ অংশ না ছাড়লে নয়, ততটুকুই কোনওক্রমে ছাড়া হয়। কিন্তু নিজে একজন পেশাদার ডিজাইনার হওয়ার সুবাদে আমি জানি নেগেটিভ স্পেসের গুরুত্ব কতখানি। এই স্পেসের ফলে ছবি দেখতে দেখতে দম আটকে আসে না, সে ছবি যতই কার্যকরী হোক না কেন।”  তাই এই বইয়ের অনেক পাতা এমনও আছে যেখানে ছবির আয়তন সামান্যই, কিন্তু পাতার সাদা নেগেটিভ স্পেস অনেক বেশি। এর ফলে প্রতি পাতায় নিঃশ্বাস নেওয়া যায়।

    চারুবালাদেবী

    জানা যায়, বাংলার নাচনি-রা তাঁদের স্বীকৃতি পাচ্ছেন আজ অনেকটাই। সরকারি আনুকূল্যে তাঁরা অনুষ্ঠান করার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রতি মাসে অবসরকালীন ভাতা পাচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিমলাদেবী, পস্তুবালাদেবীর মতো প্রবীণ নাচনিদের বিশেষ সম্মান প্রদান করেছেন। কলকাতাকেন্দ্রিক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বেশ কিছুদিন আগে থেকেই নাচনিদের এক ছাতার তলায় এনে পুনর্বাসন ইত্যাদির কাজ শুরু করেছেন, তাঁদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির তালিম দিচ্ছেন। নাচনি পস্তুবালা বেশ কিছুদিন আগে কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ঝুমুর গানের ওয়ার্কশপ করিয়ে গেলেন। তবে যাই ঘটুক, রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-বিরহ বা আধুনিক জীবনযাপনকে মুখ্য উপজীব্য করে ঝুমুর গানকে কণ্ঠে তুলে নিলেও সারা বাংলার সাংস্কৃতিক মহল এই নৃত্যশিল্পকে কখনও আপন করে নেয়নি।

    অভিজিৎ চক্রবর্তীর বইয়ের মূল প্রচ্ছদ

    ছোটনাগপুর অঞ্চলের নাচনিরা আসলে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া কিছু মুখ। তাদের জীবনে মুখোশ নেই। ক’জনেরই বা সুযোগ হয়েছে রাজাবাদশার স্নেহধন্য হবার? পঞ্চাশ-ষাট বছর আগের বাবুবাড়ির বাঈজি-জীবনও তাদের নয়। প্রথাগত তালিম নেওয়া হয়নি কোনোদিনই। অভাবের তাড়নায় কিশোরী বয়স থেকেই ঘরছাড়া। স্বশিক্ষিত নাচিয়ে হতে হতে ক্রমাগত হাতফেরতা হয়ে যৌবনদীপ্ত ‘সস্তা’ নৃত্য পরিবেশনাই তাদের বেঁচে থাকার মন্ত্র। ভরসা বলতে রসিকের সামান্য অনুগ্রহ আর ভালোবাসা। শরীরে নাচ আর কণ্ঠে ঝুমুর – এই নিয়েই ওরা এই রুখা মাটির ভুখা মানুষের আমোদ উপকরণমাত্র। আদৌ কি তা? বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বর্ণহীন নাচনিদের যেন নতুন রঙে চেনালেন অভিজিৎ চক্রবর্তী। এই সম্মান প্রদর্শনই সম্বল। আজকের বা আগামী দিনের।

    _____ 
    বইটি রবীন্দ্র সদন টিকিট কাউন্টারের সামনে বইঘর এবং কলেজস্ট্রিটে পাওয়া যায়।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @