সৌম্যেন্দু রায়ের তোলা ছবি, শ্যুটিংয়ের খসড়া খাতা, বই প্রদর্শিত হবে উত্তরপাড়ায়

কয়েকবছর আগে সৌম্যেন্দু রায় নিজেই উত্তরপাড়ার জীবনস্মৃতি-র কিউরেটর, অরিন্দম সাহা সরদারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন তাঁর সৃষ্ট আলোকচিত্রে সমৃদ্ধ কয়েকটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের কপি। দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর স্বাধীন আলোকচিত্রের শ্যুটিং পর্যায়ের বিভিন্ন খুঁটিনাটি তথ্য সংবলিত একটি ডায়েরি। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তিনি জীবনস্মৃতিকে দান করেছিলেন অনেক বই, গুগাবাবা-য় হাল্লা রাজার সভাগৃহে ব্যবহৃত একটি চাঁদমারি আর সত্যজিৎ রায়-সহ নানা পরিচালকের যে সব ছবিতে তিনি চিত্রগ্রাহকের কাজ করেছেন, সে সবের শ্যুটিং স্টিলের ডিজিটাল কপি। গবেষকদের ব্যবহারের জন্য সৌম্যেন্দু রায়ের এই দানগুলিকে সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও ব্যবহারের যথাযথ ব্যবস্থা করেছে জীবনস্মৃতি। ২০২৩ সালের ৮ মে সৌম্যেন্দু রায় সংগ্রহশালা— ‘সৌম্যেন্দু-সিন্দুক’ ঘরের উদ্বোধন করেন চিত্রশিল্পী হিরণ মিত্র এবং আলোকচিত্রী আদিনাথ দাস। এবছরেও জীবনস্মৃতি-র প্রদর্শকক্ষে ৭ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে ৩টে পর্যন্ত প্রদর্শিত হবেন সৌম্যেন্দু রায়।
১৯৬০, সৌম্যেন্দু রায়ের ডাক পড়লো সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘রবীন্দ্রনাথ’ তথ্যচিত্রের চিত্রগ্রহণে। একই সঙ্গে তাঁরই পরিচালিত কাহিনিচিত্র ‘তিনকন্যা’-য়। এবার স্বাধীন আলোকচিত্রীর ভূমিকায়। বাকিটা উজ্জ্বল ইতিহাস।
সৌম্যেন্দু রায়ের জন্ম উত্তর কলকাতায়। ৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩২ সালে। বাবা কনককুমার রায়, মা গার্গী রায়। বাবার কর্মসূত্রে শৈশব কাটে মধ্যপ্রদেশের ধরমজয়গড়ে। ১৯৪২, ১০ বছর বয়সে কলকাতায় আসেন। ভর্তি হন তীর্থপতি ইনস্টিটিউশনে। ম্যাট্রিক পাশ করার পর, সাইন্স নিয়ে ইন্টার মিডিয়েট ক্লাসের পড়া শুরু করেন আশুতোষ কলেজে। সেই সময় দিদি উপহার দিয়েছিলেন একটি কোডাক-ব্রাউনি ক্যামেরা। ওটি পেয়েই এক সহপাঠী বন্ধুর সঙ্গে মহাউৎসাহে শুরু হলো তাঁর ছবি তোলা।
নিউ থিয়েটার্স-এর শ্যুটিং দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর মনে সিনেমায় ক্যামেরাম্যান হবার বাসনা প্রবল করে তোলে। সেই সময় রক্ষণশীল যৌথ পারিবারিক মূল্যবোধে সিনেমা করিয়ে হবার পথ আজকের মত এত সহজ ছিল না। তবুও ছেলে বায়না করলো মায়ের কাছে। মা সহায়ক হয়েছিলেন তাঁর স্বপ্নপূরণে। মায়ের অনুরোধে এক আত্মীয় পরিচয় করিয়ে দেন বিখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী রামানন্দ সেনগুপ্তের সঙ্গে। তারপর একে একে জি. কে. মেহেতা, দেওজিভাই, অজয় কর, অনিল গুপ্ত, বিমল মুখোপাধ্যায়, দীনেন গুপ্ত এবং রিয়েলিস্টিক ও বাউন্স লাইটিংয়ের পথিকৃত সুব্রত মিত্র। নানা আলোছায়ার কল্পনা ক্রমে ক্রমে বাস্তবায়িত হয় প্রকৃতির পাঠশালায়।
সিনেমাটোগ্রাফার সৌমেন্দু রায়ের ৯৩তম জন্মদিনে বিশেষ প্রদর্শনী, পাঠ ও আলোচনার আয়োজন করেছে উত্তরপাড়ার জীবনস্মৃতি আর্কাইভ
১৯৬০, ডাক পড়লো সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘রবীন্দ্রনাথ’ তথ্যচিত্রের চিত্রগ্রহণে। একই সঙ্গে তাঁরই পরিচালিত কাহিনিচিত্র ‘তিনকন্যা’-য়। এবার স্বাধীন আলোকচিত্রীর ভূমিকায়। বাকিটা উজ্জ্বল ইতিহাস। সত্যজিৎ রায় ছাড়াও তিনি কাজ করেছেন তরুণ মজুমদার, তপন সিংহ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী, রাজা সেন প্রমুখ চিত্র-পরিচালকদের সঙ্গে। কাহিনিচিত্র, তথ্যচিত্র, টেলিফিল্ম, টিভি-ধারাবাহিক, পুতুলচিত্র তাঁর আলোকচিত্রে সমৃদ্ধ হয়েছে। অশনি সংকেত, সোনার কেল্লা, শতরঞ্জ কে খিলাড়ি, এবং সুচিত্রা মিত্র (তথ্যচিত্র)-এর জন্য রাষ্ট্রপতি পুরস্কার ছাড়াও অন্যান্য বহু পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন।
অরিন্দম সাহা সরদার বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “শুরুর দিন থেকেই জীবনস্মৃতি আর্কাইভের অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক ছিলেন এই মানুষটি। তিনি আমাদের রায়স্যার। আলোকচিত্রশিল্পী সৌম্যেন্দু রায়। ‘সৌম্যেন্দু-সিন্দুক’ শিরোনামে তাঁর জীবন ও সৃজন নিয়ে জীবনস্মৃতি-র ঘরে একটি বিভাগের কাজ শুরু হয়েছে গত তিন বছর ধরে। জীবনস্মৃতি গত ১৮ বছর ধরে তাঁর জন্মদিন পালন করে চলেছে নানা উদ্যোগ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। এই বছরে রায়স্যারের ৯৩তম জন্মবর্ষে তাঁকে স্মরণ এবং শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হবে একটি প্রদর্শনী, মন্ত্রপাঠ, সংগীত, নিবন্ধপাঠ ও আলোচনাসভার মধ্য দিয়ে।”
প্রদর্শনীতে থাকবে : দিদির কাছ থেকে উপহার পাওয়া কোডাক ব্রাউনি ক্যামেরায় সৌম্যেন্দু রায়ের তোলা প্রথম জীবনের স্থিরচিত্রের মূল প্রিন্ট। শ্যুটিংয়ের খসড়া খাতা। ব্যবহৃত বই, ক্যামেরা ও ফিল্টার। প্রদর্শনীর ভাবনা ও রূপায়ণ : অরিন্দম সাহা সরদার। উদ্বোধক : পরিচালক গৌতম ঘোষ।