মুক্তির মন্দির সোপান তলে-র রচয়িতা মোহিনী চৌধুরী : উপেক্ষিত এক গীতিকার

মান্না দে-র পিছনে বাঁ দিকে দাঁড়িয়ে আছেন মোহিনী চৌধুরী
গীতিকারের কথা ক’জন মনে রাখেন? আসলে গানের ধর্মই বড়ো গোলমেলে। যখন যিনি গান গেয়ে থাকেন, গান তাঁরই হয়ে যায়। সেই নিয়মেই গান পরিচিত হয় গায়ক-গায়িকার নামে। অথচ গান লিখতে বা সুর করতে নেপথ্যে রয়ে যান কত মানুষ।
কখনও-সখনও জনপ্রিয় গানের সুরকার কিছুটা কৃতিত্ব পেলেও আড়ালে থেকে যান গীতিকার৷ এই আড়ালে থাকার বেদনা সারা জীবন বয়ে বেড়িয়েছেন গীতিকার মোহিনী চৌধুরী৷ আমরা ক’জন চিনি তাঁকে? অথচ তাঁর লেখা মুক্তির মন্দির সোপান তলে, আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়, দিনদুনিয়ার মালিক তুমি, ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে, শুনি তাকদুম তাকদুম বাজে, পৃথিবী আমারে চায়-সহ অনেক গান এখনও মুখে মুখে ফেরে৷ গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, সত্য চৌধুরী, জগন্ময় মিত্র, ফিরোজা বেগম, সবিতাব্রত দত্ত-সহ কত খ্যাতনামা শিল্পী গেয়েছেন তাঁর রচিত গান।
বাঁ দিক থেকে প্রথম সারিতে তৃতীয়জন মোহিনী চৌধুরী
চল্লিশের দশকের গোড়া থেকেই তাঁর গীতিকার জীবনের শুরু৷ এক দশক না ঘুরতেই বিপুল জনপ্রিয় হয়েছিল গীতিকবির লেখা অনেক গান৷ ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ থেকে ‘আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়’ আজও বাঙালির শ্রুতির সঙ্গী হয়ে আছে৷ তিনি বেঁচে আছেন ‘দিনদুনিয়ার মালিক তোমার দীনকে দয়া হয় না’, ‘ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে, তোমারে করেছে রানি’, ‘ঝিলমিল ঝিলমিল ঢেউয়ের জলে’, ‘শুনি তাকদুম তাকদুম বাজে বাজে ভাঙা ঢোল’, ‘পৃথিবী আমারে চায়’-এর মতো কালজয়ী, জনপ্রিয় গানের মধ্যে৷ শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, শচীন দেববর্মন, কৃষ্ণচন্দ্র দে, কমল দাশগুপ্ত প্রমুখ বিখ্যাত সুরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি৷ সিনেমার গানেও তিনি প্রতিভার ছাপ রেখেছেন৷ ‘নায়িকা সংবাদ’ ছবিতে ‘কী মিষ্টি দেখো মিষ্টি’ বা ‘কেন এ হৃদয় চঞ্চল হলো’ আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে৷
মোহিনী চৌধুরীর লেখা দেশাত্মবোধক গান ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’
“কিন্তু ক’জন জানেন, এসব গানের গীতিকার কে?” ক্ষোভের সঙ্গে কথাগুলি বলছিলেন প্রয়াত গীতিকারের পুত্র বেহালার বাসিন্দা দিগ্বিজয় চৌধুরী৷ ১৯২০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর অধুনা বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়া উপজেলার ডহরপাড়া গ্রামে জন্ম মোহিনী চৌধুরীর৷ সেই হিসেবে ২০২০ সালে তাঁর জন্মশতবর্ষ পালন হয়েছে দুই বাংলা জুড়েই। দিগ্বিজয় চৌধুরী বলেন, “এপারের তুলনায় ওপারে সেই আগ্রহ বা আন্তরিকতা অনেক বেশি ছিল। ওপার বাংলার মানুষের কাছে বাবার স্বীকৃতি অনেকটা। তাঁদের অভ্যর্থনা পেয়ে আমি আপ্লুত। সেই তুলনায় এই বাংলায় বাবা অনেকটাই উপেক্ষিত।”
তবে উপেক্ষার শুরু অনেকদিন আগেই। জীবদ্দশায় অনেক উপেক্ষা সহ্য করেছেন মোহিনী চৌধুরী৷ তাঁর লেখা জনপ্রিয় গান ‘প্রচলিত’ তকমা নিয়ে বাজারে চলেছে৷ তিনি যে গান লিখেছেন, তার গীতিকার হিসেবে প্রচারিত হয়েছে কখনও কাজী নজরুল ইসলাম, কখনও মীরা দেববর্মন বা কখনও প্রিয়ব্রতর নাম৷ আবার এমনও হয়েছে বেহালায় মোহিনী চৌধুরীর বাড়ির কিছু দূরেই ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ গানটি ব্যবহার করা হয়েছে তাঁকে না জানিয়েই। এমন ঘটনা আরও আছে। ‘পৃথিবী আমারে চায়’ গানটির জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। এক প্রখ্যাত শিল্পী গানটি গাইতে চাইলেন। অথচ তিনি জানতেন, গানটি সত্য চৌধুরীর। তাঁর ভুল ভাঙিয়েছিলেন গীতিকার পুত্র নিজেই। বলেছিলেন, “সত্য চৌধুরী গানটির গায়ক মাত্র। গীতিকার আমার বাবা মোহিনী চৌধুরী।”
মোহিনী চৌধুরীর লেখা ‘পৃথিবী আমারে চায়’
দিগ্বিজয় চৌধুরী বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “তিনি অর্থ চাইতেন না, চাইতেন নিজের কাজের স্বীকৃতি৷ একবার আমার মা বলেছিলেন, এত গান লেখো, টাকা তো পাও না। বাবা হেসে বলেছিলেন, টাকা তো সেপটিক ট্যাঙ্কে চলে যাবে। সৃষ্টিটাই থেকে যাবে শুধু।’’ এমনই মানুষ ছিলেন গীতিকার মোহিনী চৌধুরী। এ দেশের প্রতি ভালোবাসার সঙ্গে কখনওই জন্মভূমি বাংলাদেশের প্রতি টানকেও অস্বীকার করতে তিনি পারেননি। শোনা যায়, নেতাজির প্রিয় গানের রচয়িতা ছিলেন মোহিনী চৌধুরী।
মোহিনী চৌধুরীর গান ১৯৪৭ সালে যেমন ভারতবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিল দেশপ্রেমে, তেমনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদেরও তাঁর অজস্র গান অনুপ্রাণিত করেছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেখানকার শীর্ষ সংবাদপত্র মোহিনী চৌধুরীর পংক্তি নিয়ে শিরোনাম করেছিল, ‘মানবের তরে মাটির পৃথিবী, দানবের তরে নয়৷’
মোহিনী চৌধুরীর জীবন ছিল বর্ণময়৷ সংগীত রচনা থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনার জগতে এসে সাফল্য পাননি৷ তারপর সংসার চালানোর জন্য বিজ্ঞানী মেঘনাথ সাহার সংসদীয় সচিবের দায়িত্ব নেন৷ তারপর এক বাঙালি শিল্পপতির আপ্ত সহায়কের চাকরিও করেছেন৷ দীর্ঘ বিরতির পর গানের জগতে ফিরে আসেন৷
‘আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড় তুমি যে বহ্নিশিখা’, গীতিকার মোহিনী চৌধুরী
স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে তাঁর মতো কালজয়ী গানের স্রষ্টাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি কেন? দিগ্বিজয় চৌধুরী মনে করেন, ১৯৬১ সালে আকাশবাণীর সঙ্গে রেকর্ড কোম্পানির সংঘাতেরও শিকার হতে হয়েছিল মোহিনী চৌধুরীকে।
কীভাবে গীতিকারের সংসার চলেছিল, সে খবর ক’জন রাখতেন? আজকের শিল্পীদের অবস্থা, জাঁকজমক তখন ছিল অকল্পনীয়। গীতিকার হিসেবে যথাযোগ্য সম্মান কখনওই পাননি মোহিনী চৌধুরী, পাননি রয়্যালটি৷ গানপ্রতি মাত্র ৬ টাকা সাম্মানিক পেয়েছেন৷ স্বাধীনতার এত বছর পরে এসে অজস্র দেশাত্মবোধক গানের রচয়িতা হিসেবেই বা কোন মরণোত্তর পুরস্কার পেয়েছেন তিনি?
পিতা-পুত্র সংবাদ
তবে এর মধ্যে আনন্দের কথা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর বেহালায় ‘মোহিনীকুঞ্জ’ নামে একটি পার্ক তৈরি হয়েছে৷ হয়েছে বুস্টার পাম্পিং স্টেশন৷ মোহিনী চৌধুরীর পরিবারের কাছে এ বড়ো স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হয়েছে। ১৯৮৭ সালের ২১ মে রেকর্ডিং স্টুডিও থেকে ফেরার পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান৷ জীবদ্দশায় স্বীকৃতি তেমনভাবে না পেলেও মৃত্যুর অনেক বছর পরে মোহিনী চৌধুরীর নাম অবশেষে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। তাঁর লেখা গান এখন আর ‘প্রচলিত’ তকমা লাগিয়ে ব্যবহার হয় না। এটাই স্বস্তি দিয়েছে তাঁর পরিবারকে। এই বছর দিগ্বিজয় চৌধুরীর উদ্যোগে গীতিকারের লেখা ১১০টি গান নিয়ে ‘মোহিনীর গানের মেলা’ শীর্ষক বইটি বাংলাদেশের কোটালিপাড়ার বহু গন্যমান্য ব্যক্তির হাতে পৌঁছেছে। তাঁরই উদ্যোগে বাংলাদেশের শিল্পী রাজিয়া মুক্তি কণ্ঠ দিয়েছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার উপর রচিত দুটি গানে- ‘সূর্য এবার নতুন আকাশে জাগো’ এবং ‘সাগরে যে ঘর বেঁধেছে ভয় সে কি পায় শিশির দেখে’।
এ বছর ৬ সেপ্টেম্বর জন্মাষ্টমী তিথিতে মোহিনী চৌধুরীর জন্মতিথি উপলক্ষ্যে তাঁর রচিত ১০টি গান ইউটিউবে প্রকাশ করেছেন দিগ্বিজয় চৌধুরী। তবে মোহিনী চৌধুরী বেঁচে থাকবেন তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিতে। মানুষ চাইলেও তাঁকে ভুলতে আর পারবেন না।
_____
ছবি সৌজন্যে: মোহিনী চৌধুরী ওয়েবসাইট