No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ৪০০০ বছরের প্রাচীন শিল্প হাতে কলমে এবার কলকাতায়

    ৪০০০ বছরের প্রাচীন শিল্প হাতে কলমে এবার কলকাতায়

    Story image

    ডোকরা শিল্পে পশ্চিমবঙ্গের আলাদা খ্যাতি যেমন আছে, তার সঙ্গে এটাও বাস্তব যে এখন আমাদের রাজ্যে এই শিল্পের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। এর প্রধান কারণ অবশ্য কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া। ডোকরার প্রচারও সেইভাবে হয় না। নতুন প্রজন্মের লোকেরা ডোকরার কাজে খুব বেশি উৎসাহিত হচ্ছেন না, ফলে শিল্পীর সংখ্যা ক্রমশই কমে আসছে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে ডোকরার ওপর একটি কর্মশালার আয়োজন করেছিল চালচিত্র অ্যাকাডেমি। গাঙ্গুলীপুকুরের নান্দীমুখ সংস্কৃতি কেন্দ্রে আয়োজিত কর্মশালাটির নাম ছিল ‘ডোকরার ডাক’। ২৪ থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চলেছিল কর্মশালা। ২৫ নভেম্বর ছিল মোমের কাজ।

     

    গবেষকদের অনুমান, ডোকরার শিল্প প্রায় ৪৫০০ বছরের পুরোনো। তাম্র-ব্রোঞ্জ যুগে সিন্ধু নদীর তীরে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, তার গুরুত্বপূর্ণ শহর মহেঞ্জোদারোতে পাওয়া গেছে নাচের ভঙ্গিতে এক মেয়ের মূর্তি। ডোকরা শিল্পের প্রাচীনতম নিদর্শন এটি। লোকমুখে শোনা যায়, ৩০০০ বছর আগে বস্তারের রাজা তাঁর স্ত্রীকে ডোকরার গয়না উপহার দিয়েছিলেন। চিন মালয়েশিয়া, জাপানের মতো এশিয়ার অন্যান্য দেশেও এই শিল্পের প্রচলন ছিল। একটি যাযাবর গোষ্ঠীর নাম থেকেই ‘ডোকরা’ শব্দটা এসেছে। মনে করা হয়, ভারতের মধ্যে ছত্তিশগড় আর মধ্যপ্রদেশ অঞ্চলে প্রথম ডোকরা শিল্পের বিকাশ ঘটে। তারপর বিহার, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গের মতো জায়গাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে এই শিল্প। আমাদের রাজ্যে ডোকরা চর্চার জন্য বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বর্ধমান, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বেশ নামডাক আছে। এর মধ্যে বাঁকুড়ার বিকনা আর বর্ধমানের দরিয়াপুরের খ্যাতি বিশ্বজোড়া।

     

    ডোকরার কাজ খুব সূক্ষ্ম। সবার আগে পুকুর থেকে লাল অথবা সাদা মাটি জোগাড় করে সেগুলো দিয়ে মাটির অবয়ব তৈরি করা হয়। তাকে মোম আর ধুনো দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের সুতো দিয়ে প্যাঁচানো হয় পুরোটা। অনেক সময় পিচ আর ধুনোর সুতোও ব্যবহার করা হয়। এর ওপর লাগানো হয় মিহি পাওডারের মতো এক রকমের মাটি। সেটা শুকোলে আরও এক স্তর মাটি দেওয়া হয়। মাটির একদিকে ওই সুতোরই একটা ফানেল তৈরি করা হয়, যেটা দিয়ে পরে গরম ধাতু ঢালা হবে। সবার ওপরে থাকে শক্ত তারের বাঁধন। তারপর এটাকে পোড়ালে মোম গলে গিয়ে ছাঁচের ভেতর একটা চ্যানেল তৈরি হয়। সেখানে ফানেল দিয়ে ঢালা হয় গলানো পেতল। অথবা পোড়ানোর সময়েই ধাতুর টুকরো রেখে দেওয়া হয় ফানেলের মুখে, যা গলে গিয়ে ভেতরের চ্যানেলে ঢুকে যায়। সেই পেতল ঠান্ডা হলে মূর্তি বেরিয়ে আসে। সব শেষে মূর্তিটাকে উজ্জ্বল করতে ঘষা হয় শিরিষ কাগজ।

     

    সেই ২০১২ সাল থেকে চালচিত্র অ্যাকাডেমি একদিকে যেমন বিভিন্ন সূক্ষ্ম শিল্পের সঙ্গে সাধারণ জনগণের সংযোগ ঘটানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তার পাশাপাশি, লোকশিল্পীদের সঙ্গে মূল ধারার শিল্পীদের পারস্পরিক মেলবন্ধনের কাজটিতেও যথেষ্ঠ অধ্যাবসায়ের পরিচয় দিয়ে চলেছে। এর আগেও এই প্রতিষ্ঠানটি ব্রতকথা, আলপনা, শোলাশিল্প, ছৌমুখোস, গালার পুতুল, বাবু পুতুল, পটচিত্রের মতো নানা বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞের আলোচনা এবং কর্মশালার আয়োজন করেছে। ‘ডোকরার ডাক’ কর্মশালায় হাতে কমে কাজ শেখাতে দরিয়াপুর থেকে এসেছিলেন শুভ কর্মকার, গৌরাঙ্গ কর্মকার, রাজেশ কর্মকারের মতো শিল্পীরা। মহানগরের প্রখ্যাত শিল্পী যোগেন চৌধুরী, তাপস কোনার, পার্থ দাশগুপ্ত, প্রসেনজিৎ সেনগুপ্তরাও নিজেদের মতো করে সৃজনের পাঠ দিয়েছেন। গালাপুতুল শিল্পী বৃন্দাবন চন্দ্র, বাবুপুতুল শিল্পী শম্ভুনাথ দাস, আলপনা শিল্পী বিধান বিশ্বাস যেমন এসেছিলেন, তেমনই ছিলেন নানা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা উৎসাহী মানুষেরা। সব মিলিয়ে কমবেশি ৪০ জন মানুষ এই কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলেন। গোটা কর্মশালাটির সার্বিক পরিকল্পনা পরিচালনা করেছেন শিল্পী মৃণাল মণ্ডল। শিল্প ঐতিহাসিক সৌজিত দাস গোটা অনুষ্ঠানটির ডকুমেন্টেশন করেন, যাতে পরবর্তীকালের রসজ্ঞ এবং গবেষকদের জন্য কর্মশালাটি ফলদায়ী হয়ে উঠতে পারে। 

    ছবি সূত্র - কুণাল গাঙ্গুলি

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @