জুড়িগাড়ির জমানায় সেদিন ধূমকেতুর মতো দেখা দিল এক বাঙালি বিশ্বকর্মা

অলংকরণ - পার্থ দাশগুপ্ত
নগর কলকাতা তখন সাবালক হতে চায় নিজের মতো করে। নানা ঘটনার হাত ধরে সে এগিয়ে চলে গুটিগুটি পায়। সাহেবসুবোদের কাজ কারবারেই তখন কলকাতার এ-মাথা ও-মাথা জুড়ে একটা সাজো সাজো রব তৈরি হয়েছে যেন। আসলে লন্ডনের জুড়ি নগরী বলে কথা। এ শহরটাকে তো স্বদেশের দোসর করে তুলতেই হবে। সেই দিক নির্দেশিকা মাথায় রেখেই একদিন কলকাতা তৈরি করে ফেলল নিজের মতো করে যানবাহন চরিত। মোটামুটি ভাবে গরুর গাড়ির যুগ বেয়ে এসে কলকাতা ততদিনে প্রবেশ করেছে পালকিবাহকের যুগে। সে নিয়ে কী কম উদ্দীপনা! নানা রকমের পালকির দল তখন চলাচল করে কলকাতা জুড়ে। কিন্তু সেসব পালকি নিয়ে লোকজনের অশান্তির শেষ নেই। এই বুঝি বেহারা এসে বলে ‘মশালের তেল ফুরিল কিছু পয়সা দিন বাবু’, আবার বুঝি না দিলে সুড়ুৎ করে পালকি নামিয়ে দিয়ে বেহারা হাওয়া হয়ে গেল বোধহয়। সব মিলিয়ে ‘ছয় বেহারা জোয়ান তারা’ গল্পের সঙ্গে বাস্তবের তখন অনেক ফারাক। ইবন বতুতা থেকে শুরু করে বিলিতি শিল্পী সলভিন্স এঁকে রেখে গেলেন পালকির ছবি। সলভিন্স নিজে আবার পালকির গায়ে নকশা এঁকে পয়সাও রোজগার করেছেন বেশ কিছুকাল। তা যাই হোক একদিন এই কলকাতার বুকে পালকি বেহারারা ধর্মঘট করে বসল।
সেটা ১৮২৭ সন। সরকার বাহাদুর একপ্রকার বাধ্য হয়েই পালকি বেহারাদের ওপর কিছু আইন জারি করেছে, আর তাতেই যত বিপত্তি। সবাই মিলে ঘোষণা দিল আমরা আর পালকি চালাব না। এসব দেখে গল্পের মতো এক কাহিনি ঘটিয়ে বসলেন জনৈক সাহেব। তিনি দিলেন পালকির ডাণ্ডা খুলে। তারপর তাতে চাকা লাগিয়ে ঘোড়া দিয়ে টানা দিলেন সেই চাকা লাগানো পালকির খাঁচাকে। ব্রাউন সাহেবের এমন গাড়ি নামও হল তাঁরই নামে। লোকে বলতে লাগল ‘ব্রাউন বেরি’ বা ব্রাউন ক্যারেজ। এই হল গিয়ে পালকি থেকে পালকি গাড়ির ইতিহাসের টানাপোড়েন। পরবর্তীকালে অমন ব্রাউন বেরির সাথে পালকির খানিকটা মিলিজুলি করে গ্রিনফিল্ড সাহেব বানালেন আরেকটা গাড়ি। তার নাম হল ‘গ্রিনফিল্ড’। তারপর একে একে হ্যাকনি ক্যারেজ, ফিটন, ভিক্টরিয়া, ল্যান্ডো, ব্রুহ্যাম সঙ্গে আরও কত গাড়ি। এসবের ব্যবসা শুরু হয়ে গেল কলকাতায়। ১৭৯০-র আগে থেকেই কোচ মেকার-রা আসতে শুরু করল কলকাতায়। এডওয়ার্ড শ্যান্ডলার, রবার্ট গ্রেঞ্জ, জেমস স্টুয়ার্ট, জেমস ওয়াটসন এঁরা এসে কোচ বানানোর বাণিজ্য পাতলেন নগরে। এরা আমদানি করতেন, ভাড়া খাটাতেন আবার আস্তাবল করে ঘোড়াও রাখতেন। দেখতে দেখতে বাহারি ঘোড়ায় টানা গাড়ি চলতে লাগল কলকাতায়।
আজও পথ চলতে চলতে অক্রুর দত্ত লেনের ১৬ নম্বর বাড়ির দিকে যদি কারও চোখ পড়ে তবে তিনি দেখতে পাবেন জীর্ণ দরজার মাথায় লাগানো রয়েছে ব্রিটিশরাজের ইনসিগনিয়া।
এসব দেখে কোনও কোনও বাঙালির মাথায় চাপল ক্যারেজ বা কোচ বানানোর নেশা। ওদের মাথায় তখন এই নয়া ব্যবসায় নিজের নাম করতে হবে - এই বাসনা। মধ্য কলকাতার ঘোষবাড়ির এক কর্তা খুলে বসলেন কোচ বানানোর ব্যবসা। এ সি ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানি। আজও পথ চলতে চলতে অক্রুর দত্ত লেনের ১৬ নম্বর বাড়ির দিকে যদি কারও চোখ পড়ে তবে তিনি দেখতে পাবেন জীর্ণ দরজার মাথায় লাগানো রয়েছে ব্রিটিশরাজের ইনসিগনিয়া। আর গেটের এক পাশে ফলকে লেখা ‘এ সি ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানি, কোচ বিল্ডারস, বাই অ্যপয়েন্টমেন্ট দ্য ভাইসরয় অ্যন্ড গভারনর অফ বেঙ্গল’।
এই বাড়ির এই সামান্য একটা ফলক আর জীর্ণ ইনসিগনিয়া আমাদের অতীত ইতিহাসের এক অন্য পাতায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। আমরা এই জীর্ণতার জাল কাটিয়ে প্রবেশ করতে পারব বাঙালির উদ্যোগ ভাবনার পর্বে। ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর নাম তো আমরা জানি, কিন্তু ক’জন জানি কোচ বানানোর খেলায় নেমে বাঙালি একদিকে ব্রিটিশের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে অন্য দিকে সে দাপটের সঙ্গে ছিনিয়ে আনতে পারছে খোদ রাজার অনুমোদন। এই ঘটনাটাই বৈপ্লবিক। যে বিপ্লবের মূল কথা হল জুড়িগাড়ির জমানায় সেদিন ধূমকেতুর মতো দেখা দিল এক বাঙালি বিশ্বকর্মা। এটাই অনেক। এই টক্কর দেওয়ার সময়ের সাক্ষী ওই ফলক আর সিংহমার্কা জীর্ণ ইনসিগনিয়া।
এই যে ঘোষবাড়ির কথা বললাম, এই বাড়িতেই বেশ কয়েকবছর আগেও শোনা যেত সংগীতের নানা ধরনের মূর্ছনা। সেই সুরের রঙে আকৃষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন অনেক পথচারী। তারপর ভেতর থেকে যে ফর্সা, লাল গালের বৃদ্ধটি বেরিয়ে আসতেন, তিনি হলেন ভারতীয় সংগীতজগতের এক অন্যতম প্রবাদপ্রতিম সুরকার ভি বালসারা। আজও এই বাড়িতে সেই স্মৃতি বেঁচে রয়েছে তাঁরই নাম লেখা একটি চিঠি ফেলার বাক্সের গায়ে।