No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    বাংলার পীর – ৯ 

    বাংলার পীর – ৯ 

    Story image

    মেদিনীপুরকে বলা হয় পীরের শহর। ফুরফুরার পীর হজরত আবুবক্কর সিদ্দিকী যে বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তারই ষষ্ঠ পুরুষ ছিলেন হাজী মোস্তাফা মাদানি। তাঁর সময়ে ভারতের বাদশা ছিলেন ঔরঙ্গজেব। বাদশা ঔরঙ্গজেব ছিলেন তাঁর শিষ্য। তিনি সমগ্র বঙ্গদেশ হাজী মাদানিকে দিতে চেয়েছিলেন বলে শোনা যায়। কিন্তু নিতে চাননি পীর মাদানি, বরং কেল্লায় অবস্থান করে তিনি ঔরঙ্গজেবের সৈন্য পরিচালনা করেছিলেন, কেল্লাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মাজার রয়েছে মেদিনীপুর শহরে। তাঁরই স্মৃতিতে এলাকার নাম হয় মাদানিপুর। যেমনভাবে কলকাতার মৌলা আলি পীরের নামে শিয়ালদহের পাশের স্থানের নাম রাখা হয়েছিল। পরবর্তীকালে মৌলা আলির নাম হয়েছিল মৌলালি, ঠিক একই রকমভাবে মাদানিপুরের নাম হয়েছিল মেদিনীপুর। পীর রুহুল আমিন এই তথ্য লিপিবদ্ধ করে গেছেন। বাদশা, গুরুর প্রতি ভক্তি দেখাতে সাড়ে ৫০০ বিঘে জমি দান করে গিয়েছিলেন। পীর মাদানির টানে বাগদাদ থেকে আরও অলি বঙ্গদেশে আসতে লাগলেন। ধীরে ধীরে মাদানিপুর হয়ে উঠল পীরের শহর।

    মেদিনীপুরে সর্বশেষ যে পীর জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি সৈয়দ মুর্শিদ আলি আলকাদরি। এপার-ওপার দুপার বাংলাতেই তিনি সমান জনপ্রিয়। তাঁর নজরগাহ্ কলকাতা, ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, সাতক্ষীরায় রয়েছে। ১৯৫২ সালে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। সেদিনটা ছিল চৌঠা ফাল্গুন। প্রতিবছর চৌঠা ফাল্গুন তাঁর উরুস শুরু হয়। চলে সাতদিন। লোকে মানত করতে আসেন, পীরের দরগায় এসে মোনাজাত করেন। ছেলেমেয়ের মঙ্গল কামনা করেন। বাংলাদেশ সরকার এইসময় বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করে। নদিয়ার গেদে সীমান্ত দিয়ে সুসজ্জিত এই ট্রেন এপারে আসে, যায় মেদিনীপুরে। প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে আসা ভক্তের সংখ্যা বাড়ছে। একটা ট্রেন আসে বলে বাংলাদেশে লটারি করতে হয়। বিশেষ নিরাপত্তা দিয়ে তারপর ট্রেন আসে।

    পীর আলকাদরির ছোটবেলার নাম ছিল আলি সামসুল কাদের। তাঁর জন্ম মেদিনীপুরের পিয়ারডাঙায়। মাত্র ৯ বছর বয়সে তিনি ঈশ্বরের আরাধনা শুরু করেন। ১২ বছর তিনি নিভৃতে এবাদত করেন মেদিনীপুর স্টেশন থেকে একটু দূরে। সেই ছোটো বয়স থেকেই তাঁর শিষ্য তৈরি হল। কথিত আছে এই ১২ বছর তিনি বাইরে আসেননি। তিনি ছিলেন সুপুরুষ। সুন্দর দেখতে ছিলেন বলেই তিনি নিজের পরিবারের বাইরে যখন আসতেন তখন মুখ ঢেকে রাখতেন, শোনা যায় এমন হয়েছে যে তাঁকে মেয়েদের মতো বোরখা পরে বাইরে আসতে হয়েছে। যেখানে তিনি যেতেন সেখানেই তৈরি হয়েছে খানকা শরিফ। তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন তখন ইংরেজ আমল। তিনি নিজে ছিলেন আরবী, উর্দু, ফারসি ভাষায় পণ্ডিত, কিন্তু তাঁর শিষ্যদের ইংরেজি ভাষাতেও দক্ষ হতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। পীর আলকাদরি ছিলেন হিন্দু-মুসলমান সবার কাছে সমান জনপ্রিয়। প্রতি বৃহস্পতিবার তাঁর দরগায় বহু মানুষ আসেন, শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত থাকেন। তাঁরই প্রপৌত্র পীরজাদা সৈয়দ রসদান আলি কাদরি বলছেন, প্রতিদিন পীরের রওজায় শয়েশয়ে মানুষ আসেন, মানত করেন, দোওয়া চান, এঁদের মধ্যে মুসলমানের চেয়ে হিন্দু বেশি। ফজলুল হক থেকে শুরু করে তৎকালীন বহু রাজনৈতিক নেতা তাঁর কাছে আসতেন, পরামর্শ নিতেন, কিন্তু সুফিবাদ ও ইসলামই ছিল তাঁর সব। সম্প্রীতি নষ্ট হলে তিনি ছুটে গেছেন। শোনা যায় তিনি যে তেল আর জল পড়ে দিতেন তাতে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতেন বহু মানুষ। আজও তাঁর দরগা থেকে তেল, জল পড়া নিয়ে যান অনেকেই। তাঁর বহু অলৌকিক কাহিনী রয়েছে দু বাংলাতেই। শোনা যায়, বীরভূমের দাতা পীরের শিষ্যরা তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। পীর কাহিনি থেকে জানা যায় দাতা পীর শুধু লুঙ্গি পরে থাকতেন, দেহের উপরের অংশে কিছু পরতেন না। কোনো বুজুর্গ মানুষ এলেও তিনি এভাবেই থাকতেন। একদিন দেখা গেল, সাতসকালেই তিনি জামা গায়ে দিয়েছেন। তাঁর শিষ্যরা জিজ্ঞাসা করলেন, হুজুর আজ আপনার গায়ে জামা কেন? দাতা পীর বললেন, আজ তাঁর কাছে আসছেন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ অলি। যিনি এলেন তিনি পীর আলকাদরি।

    প্রতিবছর চৌঠা ফাল্গুন মেদিনীপুর শহর পুণ্যতীর্থ হয়ে ওঠে। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়। সব ক’টা পীরের রওজা ঘুরে দেখেন মানুষ। মেদিনীপুর স্টেশনে নেমে মিয়াবাজারে রিকশা নিয়ে যেতে হবে। হেঁটেও যাওয়া যায়। জোড়া মসজিদে পীরের রওজা। বহু হোটেল রয়েছে এখানে। পীরের দরগাতেও থাকা যায়। রসদান সাহেব বলছিলেন, বাড়িতে থাকতে দেওয়া হয় কেবল তাঁদের শিষ্যদের।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @