No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    বাংলার পীর-১

    বাংলার পীর-১

    Story image

    মানবতার আদর্শকে বাস্তবায়নের জন্য এদেশে পীর বা সুফি - দরবেশের আগমন সেই অষ্টদশ শতাব্দীর শুরু থেকে। পীর কাব্য, পীর নাটক, পীর লোককথা, পীরের জীবনী থেকে জানা যায়,সুফি দরবেশ, পীররা এদেশে এসেছিলেন ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে। তবে হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে এক অদ্ভুত সমন্বয়ের চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা। পীররা তাই সর্বজনীন হয়ে উঠেছিলেন। পীরের দরগায় আজও তাই মাতোয়াল্লি কোথাও হিন্দু, কোথাও মুসলমান। যে পাঁচ পীরের কাহিনী পীর সাহিত্যে বা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে, তার অন্যতম হলেন একদিল শাহ্। তাঁর অলৌকিক কাহিনী এখনও মানুষের মুখে মুখে।

    ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রায় ৮০০ বছর আগে উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতের কাজীপাড়ায় এসে তিনি আস্তানা তৈরি করেছিলেন। হজরত পীর একদিল শাহ্‌ ছিলেন খাজা মইনুদ্দিন চিস্তির শিষ্য। তখন বারাসাতের নাম ছিল আনোয়ারপুর পরগনা। কাজীপাড়া তখনই ছিল বনেদি মুসলমানের গ্রাম। সেই গ্রামের ছোটু মিয়াঁ ও তাঁর স্ত্রী ছিলেন নিঃসন্তান। তাঁদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন হজরত একদিল। বাগদাদ থেকে এসেছিলেন তিনি। তখন গৌড়ের সুলতান ছিলেন হোসেন শাহ্‌। হজরত একদিল শাহ্‌র আসল নাম ছিল আহমদ উল্লাহ রাজী। তখন কাজীপাড়ার পাশে ছিল সূবর্ণরেখা নদী। সে নদী এখন ছোট্ট খাল। তাঁরই পশ্চিমপাড়ে একদিল শাহর মাজার। আজও তার ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। কেউ মাজারে এসে দোওয়া করেন, কেউ এসে চাদর চড়িয়ে যান। প্রতি বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত বহু মানুষ আসেন। মাজার জিয়ারত করেন, মনের ইচ্ছা জানান, রোগ-শোক থেকে মুক্তি চান।

    পৌষ সংক্রান্তির আগের রাতে মৃত্যু হয়েছিল হজরত পীর একদিল শাহের। প্রতি বছর এদিনে শুরু হয় উরুস উৎসব। মেলা বসে দরগার পাশে, ৮ দিন ধরে চলে উরুস উৎসব। উরুস শুরুর আগের রাতে মাজারে প্রথম শিরনি দিয়ে যান রাজা রামমোহন রায়ের বংশধররা. সঙ্গে দেন সমপরিমাণ নজরানা। তারপর শুরু হয় উরুস। আজও এই রীতি চলছে। দরগার পাশে রয়েছে উঁচু মিনার। বারাসাতেরই বিজয় বিশ্বাস তৈরি করে দিয়েছিলেন এই মিনার। উরুসের আগের রাতে এখানে নহবত বাজে। ক'বছর আগে থেকে আর সানাইবাদকের দেখা পাওয়া যায় না। এখন সানাইয়ের সুর শোনা যায় মাইকে। রাজা রামমোহন রায়ের বংশধররা পীরের ভক্ত ছিলেন। দরগাহর উন্নতির জন্য ন'শ ঊনত্রিশ বিঘে পাঁচ কাঠা জমি তাঁরা দান করেছিলেন। উরুস শুরুর আগের রাতে এখন আর রায় বংশের কেউ আসেন না, তাঁদেরই মনোনীত গোবরডাঙার জমিদার বাড়ির সদস্য আসেন, না হলে উরুস শুরু হবে না।

    ভারতের লৌকিক জীবনে জড়িয়ে রয়েছেন ঐতিহাসিক আর কাল্পনিক পীর। একদিল শাহ ছিলেন ঐতিহাসিক পীর। জানা যায়,ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য তিনি এদেশে এলেও কখনও হিন্দুদের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ হয় নি। তাঁর লড়াই ছিল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে। তখন বারাসাতেরই আনোয়ারপুরের শাসক চাঁদ খাঁ-র সঙ্গে তাঁর বিরোধ ছিল। চাঁদ খাঁ-র অহমিকা, দরিদ্র মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, পীর একদিল সহ্য করতে পারতেন না। রাখালের ছদ্মবেশে তিনি ঘুরে বেড়াতেন। অলৌকিক শক্তির নিদর্শন রাখতেন। তাঁর গোরু আর পাখি প্রীতি ছিল অসম্ভব। তাঁর নজরগাহে গাছে থাকা বাদুড় মারা নিষিদ্ধ। তাঁর দরগায় রয়েছে পায়রা। এই এলাকায় পায়রা হত্যা নিষিদ্ধ। দরগার পাশে রয়েছে পায়রা থাকার ঘর। কোনো পায়রা অসুস্হ হলে তাকে নির্দিষ্ট ঘরে রেখে দেওয়া হয়। দরগার খাদেমদার বলছেন, "পীরের রহমতে কয়েকদিন পর সুস্থ হয়ে সে ফের উড়তে শুরু করে।"

    ছোটু মিঁয়া জীবিত থাকতেই একদিল শাহর মৃত্যু হয়েছিল। কবরস্থান বা রওয়াজ শরিফে দুটি বাঁশ রয়েছে এখনও। পাকা কবরস্থান তৈরি করে দিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়ের বংশধররা। কাঁচা কবরস্থানে যে বাঁশ দুটো ছিল তখন, আজ ৮০০ বছর পরও পীর একদিল শাহর; স্মৃতি বহন করছে তা।

    হিন্দু -মুসলমান সবার কাছে পীর একদিল শাহ আজও সমানভাবে গ্রহণীয়। বহুবার এখানে দাঙ্গা সংগঠিত করার চেষ্টা করেছে একদল। কথিত আছে, ১৯৬৪ সালের দাঙ্গায় বারাসাতের কাজীপাড়ায় দু 'ধর্মের মানুষের কোনো অনিষ্ট হয় নি। সারারাত এক যোদ্ধার বীরদর্প শুনতে পেতেন মানুষ। তিনি হজরত পীর একদিল শাহ। মানুষ তাঁর দরগায় আসেন। দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ দিনরাত এখানে পড়ে থাকেন, অনেকেরই রোগমুক্তি হয়েছে, নিঃসন্তানের সন্তান হয়েছে,বলছিলেন স্থানীয়রা। দূর থেকে মানুষ এলে তাঁদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন খাদেমদারা। পীরের স্মৃতিতে রয়েছে স্কুল, লাইব্রেরি। বহু স্মৃতি বিজড়িত দরগা এটা। চারিদিকে সাবেকি গাছ। ছায়া ঘেরা রওয়াজা। পাশে মজে যাওয়া সূবর্ণরেখা নদী।এই নদীতে একসময় সপ্তডিঙা মধুকর ভাসত। কলকাতার থেকে বারাসাত স্টেশনে নেমে ভ্যানরিকশায় ১০ মিনিট জগদিঘাটা কাজীপাড়া। চাঁপাডালি বাসস্ট্যান্ড থেকেও রিকশায় ১০ মিনিট। কাজী মনজুর-উল আলম বলছিলেন, সরকার একটু নজর দিলে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যেত পীরের সম্প্রীতির বার্তা।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @